সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


সবুজের কাছে ঘাসফুলের কাছে

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯      

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ

খেলতে বসেছি। খেলছি। ঘাসপোকার সঙ্গে। পুতুলের সঙ্গে। ডাহুকের সঙ্গে। খেলতে বসে ভুলে গেছি তরতাজা শৈশব। হা-ডু-ডু খেলার বিকেল। কাশবনের দৌড়। আমাকেও ভুলে গেছে কত প্রিয় মানুষ। প্রিয় যমুনা। প্রিয় পালতোলা নৌকো। আমাকে মনে রাখেনি কেউ। আমাকে ধরে রাখেনি কেউ। আমায় জেনে রাখেনি কেউ। আমাকে বুঝেনি কেউ। আমি শরতের সাদা সাদা ছবি হয়েছি প্রকৃতির শরীরে। হেমন্তের শিশিরভেজা ঘাসে। কুয়াশার কৃষ্ণ চাদরে ঢেকে যাওয়া গোধূলিতে। মেঠোপথের ধুলো মেখে গাঁয়ে আমি বেশ পুরোনো হয়ে গেছি। আমার গাঁয়ে রোদে পোড়া রাখালের গন্ধ। আমায় পায়ে লেগে আছে ঘরছাড়া কানাকুক্কোর আলসে সুর। চোখে জমে আছে বেলুন উড়ানো দিনের গুমোট কুয়াশা। তারপরও আমি শরতের কাশফুলের মতো কী দারুণ বেঁচে আছি। হেমন্তের শিশির ফোঁটার মতো চিকচিক করছি। দূর কুয়াশার চাদর থেকে বেরিয়ে আবার দৃশ্যমান হচ্ছি। হেঁটে চলছি প্রকৃতির হাত ধরে। দু'তিনটে পা বাড়িয়েই ধূলিপথ ধরে ঘর ছেড়ে আমি এসে যাই অদূরে সবুজের কাছে ঘাসফুলের কাছে। চারপাশ তাকালে নিবিড় বুঝতে পারি আমি একা নই। আমাকে জড়িয়ে আছে, আমার ডানে বামে কত বিধিলিপি। ঘাসফুলগুলো কবিতার মতো মায়াবী চোখে তাকিয়ে থাকে। বাবুই শিখিয়ে দেয় শৈল্পিক জীবন। ঘুঘুর প্রেমে পড়ে হয়ে যায় লজ্জাবতী নারী। বাতাস বাঁশি বাজিয়ে আমায় খুশি রাখে। বুঝতে পারি আমি আর একা নই। আমার যেন সব আছে। সবই আছে। কথা বলা ঘুড়ির মতো আমি হাঁটতে শিখে যাই। আমাকে কেউ বলতে শেখায়নি। আমাকে কেউ চলতে শেখায়নি। আমাকে কেউ খেলতে শেখায়নি। আমায় যা শিখিয়েছে, সব এই অদ্ভুত প্রকৃতি। প্রকৃতি আমার গুরু। আমি আজন্ম ঋণী প্রকৃতির দোরগোড়ায়।

পাথর হয়ে গেছে সব। মেঠোপথ দখল নিয়েছে কালো পিচ। হেলে দুলে আর চলে না পোষা গরুর গাড়ি। নাইওর খেতে যায় না দূরে কোথাও, কেউ। দু'চাকার বাইক কিংবা তিন চাকার অটো ধাপিয়ে বেড়ায় সারাটা দিন ক্লান্তিহীন। টুকটাক শব্দ বলে চলে না আর ঘোড়ার গাড়ি। আমিও পাথর হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। পাথর হয়ে যাচ্ছে সখা মন।

চিঠি লিখি না আর ভুল বানানে চিঠি পাঠাই না ভুল ঠিকানায়। ভুলে গেছি কলম তুলে কয়েকটা সাদা খরচ করে একটা চিরকুট লিখতে। হাত থমকে আছে। আর লিখতে ইচ্ছা করে না পথভোলা দিনের গল্প। আলোহীন অন্ধকারের গল্প। পথ হাড়া পথিকের গল্প। আমি তো নিজেই চলে গেছি পথ ছেড়ে বেপথে। আমাকে গৃহহারা করেছে যাযাবর সময়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমি ক্লান্ত প্রাণ। যেখানে সেখানে পড়ে আছি সময়ে-অসময়ে। আমি যাযাবর হয়ে যাচ্ছি কালভাদ্রের কলমি ফুলের মতো।

আমারও যে ইচ্ছা হয় মেঘের মতো দলছুট সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হতে, ঘুড়ে বেড়াতে হাজারো পাখির দলে। শুভ্র মেঘের ভেলায় চড়ে দূরে কোনো শান্তির পথে যেতে। আফসোস! শরতের শুভ্রতা শেষে হেমন্তের মতো আমার মাথার ওপরে কৃষ্ণ নীলচে কোনো আকাশ নেই। নেই কোনো শুভ্রতা। নেই তুলতুলে সাদা বকের মতো সাদা সাদা মেঘ। শিশিরভেজা অহ্নাঁকাবাঁকা কোনো পথ নেই। প্রকৃতি সিক্ত করা মৃদু জলফোঁটা নেই। যমুনার ঘোলা জলে ভেসে

আসা খড়কুটোয় খুঁজে পাই শান্তির বারতা। মাছরাঙা বকের মতো আমি শান্তি খুঁজি পথে-ঘাটে, পুকুরে-নদীতে, খালে-বিলে, হাওরে-বাঁওড়ে। মহাকাল ডুবে গেছে ঝমধরা রোদের বালিশে। কালঘুমে তলিয়ে গেছে মাটির পুতুলগুলো। আমারও খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাব। দু'দণ্ড শান্তির খোঁজে আমি ক্লান্ত এ পার্থিব জগতে। হানাহানি, সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষের শত বাধা, শত সংগ্রাম শেষে এগিয়ে যেতে চাই শান্তির পথে। সৃষ্টিকর্তা, আমায় শান্তি দাও। আমাদের প্রশান্তি দাও। আমরা শান্তি চাই।

শান্তি চায় আমার মতো পৃথিবীর শত কোটি, অগণিত শান্তিহীন মানুষ।া