সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


রঙের মানুষ

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

শফিক শাহরিয়ার

মানুষের জীবনটা অপূর্ব সুন্দর। কিছু সময় ছন্দবদ্ধ, কিছু সময় ছন্দহীন। ভালোবাসার বিচরণে একসময় ছন্দহীন সময়ও ছন্দবদ্ধ হয়ে ওঠে। জীবনটা কখনও বিষণ্ণতার চাদরে, কখনওবা প্রীতির আদরে। জাগতিক জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে গড়ে ওঠে আহদ্মাদের সংসার। এখানে অবলীলায় আপন হয়ে যায় মানুষ। জীবনের প্রকৃত সুখ আবিস্কার করতে কে না চায়! মানুষ অনন্তকাল হাঁটতে চায় সুখ আবিস্কারের পথে। তেমনি আবিস্কারের পথে আ. হাকিম। পরিশ্রমী মানুষ তার বন্ধু। দিনটা পরিশ্রমেই কাটে। শরীরে যেন কোনো ক্লান্তি নেই!

আ. হাকিম পেশায় একজন রংমিস্ত্রি। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর। কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও খুব বেশিদিন তার মন টেকেনি। অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর কয়েক বছর ধরে রাজশাহীতে কাজ করছেন। শহরের আনাচে-কানাচে তার কাজের যথেষ্ট সুনাম। এমনকি বেশ কয়েকটি বড় বিল্ডিংয়ে তিনিই রংয়ের কাজ করেছেন। এ কাজ শিখেছেন সেই ছোটবেলায়। অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারান। কোনোমতে প্রাইমারি পাস করে পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেন।

বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে শহরে এলেন। এটা সত্য যে, মনের দিক থেকে তিনি অসহায় ছিলেন না। প্রথমে কেউ তাকে কাজ দিতে রাজি হয়নি। কিছুদিন পর দুয়েকটা কাজের সন্ধান পেলেন। সবাই তার কাজের প্রশংসা করে। যে বাসায় রং করেন, রাস্তা দিয়ে চলতে সবাই ওখানে থমকে দাঁড়ায়। তারা বাসাওয়ালার সঙ্গে কথা বলে মিস্ত্রির খোঁজখবর নিতে থাকে। দিন দিন মিস্ত্রির হাতে কাজের চাপ বাড়তে লাগল। তিনি একজন হেডমিস্ত্রি। দু-তিন সাইটে কাজ চলে। নিয়মিত কাজগুলো তদারক করতে হয়। প্রতিদিন তার সঙ্গে অনেক শ্রমিক কাজ করে।

কিছুদিন আগের কথা। তখন মিস্ত্রির হাতে কোনো কাজ ছিল না। জমানো কয়টা টাকা ফুরাতে সময় লাগে না। ঘরে শুয়ে আর বসে থাকতে একসময় খুবই বিরক্ত হলেন। দেখতে দেখতে পকেট শূন্য। স্ত্রীকে বাজার খরচ দিতে হিমশিম খেতে হয়। এরপর অনেক ভেবেচিন্তে উপায় বের করলেন। বাসার কাছে মস্ত বড় একটি মুরগির খামার। ওখানে অনেক শ্রমিক কাজ করে। একদিন তিনি খামারের মালিকের কাছে গিয়ে বললেন, আমার হাতে কোনো কাজ নেই। সংসার চালাতে পারছি না। আমাকে দয়া করে একটা কাজ দিন।

মালিক বললেন, কাজ দিতে পারব। কিন্তু বেতন প্রতিদিন দুইশ টাকা। প্রতিদিন বিভিন্ন বাজার থেকে গাড়িভর্তি মুরগি কিনে আনতে হয়। গাড়িতেই যাওয়া-আসা। হাঁটাহাঁটি করতে হবে না। শুধু হিসাব-নিকাশ করতে হবে। দিন শেষে আমার কাছে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে। আরেকটি কাজের সুযোগ আছে। খামারে রাতে থাকলে পঞ্চাশ টাকা করে পাবেন। আরেকটা লোক থাকবে। একদিন পরপর আপনার ডিউটি।

অবশেষে ব্যথার পানি লুকিয়ে মিস্ত্রি হাসিমুখে রাজি হয়ে গেলেন। সংসারের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। মিস্ত্রির বউ রাহেলা সারারাত জেগে কাটান। কখনওবা স্বামীর সঙ্গে খামারে গল্প করে রাতটা কাটিয়ে বাসায় আসেন। স্ব্বামীর রংয়ের কাজের জন্য প্রার্থনা করেন। এভাবে তিন-চার মাস কেটে গেল।

অবশেষে তার হাতে এলো রংয়ের কাজ। সে এ কাজের শিল্পী। জীবনে হয়তো বড় কোন শিল্পী হবার স্বপ্ন ছিল তার মনে। সে স্বপ্ন এখন বেঁচে থাকার আশ্রয়। সংসার এখন আবার চলতে শুরু করেছে স্বাভাবিক গতিতে। আবার কখন থমকে যাবে সে চিন্তা ভুলে তিনি এখন রং তুলি নিয়ে ভাবেন বেশি। া