সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


স্মৃতিঘেরা দিন

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

মিজানুর রহমান রনি

সাদাকালো পিকচার কোয়ালিটি। টিভির স্ট্ক্রিনে বাজছে বাংলা সিনেমার অতি পরিচিত গান 'বন্ধু আমার... '। পরপর দু'বার শুনতেই আনমনে হারিয়ে যাই ফ্লাশব্যাকে। সেই ছোট্টবেলায়। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, ছোট-বড় সব ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া সেই স্মৃতিঘেরা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। সবার মতো আমার কাছেও হারানো শৈশব প্রিয় ও আনন্দের।

ছোটবেলার সেই প্রিয় বন্ধুদের মুখগুলো বারবার ভেসে ওঠে হৃদয়ের ক্যানভাসে। দু'চোখের পাতা এক করতেই যেন আরও স্বচ্ছ, স্পষ্ট দেখি সব। জগতে হাজারো সম্পর্কের মাঝে এই একটা সম্পর্কই আছে, যা দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হয়। সারাজীবন তুই করে বলা যায়। আপন করে নেয়া যায়। মনের কথা বলা যায়। যে কথা সবার কাছে গোপন সে কথাও বলা যায় নির্দি্বধায়। হাজারো কথার মাঝে অনেক কথা তবুও যেন রয়ে যায়। ইচ্ছে মতো ঝগড়া করা যায়। নিশ্চিন্তে-আনমনে হারিয়ে যাওয়া যায় পৃথিবীর সবখানে।

ছোট্টবেলার সেই বন্ধুদের মধ্যে 'প্রকৃতি' ছিল আমার কাছে স্পেশাল কেউ। তার কথা আজ বেশ মনে পড়ছে। প্রকৃতি নামটা বন্ধুদের ব্যাপক বিনোদনের খোরাক জোগাত। কত যে মজা আর দুষ্টুমি করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সজলের একটা কমন ডায়ালগ ছিল, 'প্রকৃতি স্কুলে না এলেও আমরা কিন্তু প্রকৃতিকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারি না।' দেখতে দেখতে স্কুল লাইফ শেষ। স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেওয়ার ওই মুহূর্ত থেকে কেমন যেন একটা শূন্যতা অনুভব করি। এতো কাছের মানুষগুলো এতো দ্রুত সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব! এটা তখনও বুঝতে পারিনি। আমাদের অনকের কাছে এটা ছিল অকল্পনীয়। এটা কেমন করে মেনে নেব? এই স্কুলে যখন ভর্তি হই, তখন তো ঠিকমতো কথাও বলতে পারতাম না। ধীরে ধীরে সেই আমরাই বনে যায় কথাপটু। আমাদের মাঝে গড়ে ওঠে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। খেলার সঙ্গী, পড়ার সঙ্গী, আনন্দবেদনার সঙ্গী হয়ে চিরদিন থাকা সম্ভব নয়, তা সেদিন টের পাইনি। আজ বিদায়ের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে প্রকৃতি ঢাকায় চলে আসে। তারপর আজ পর্যন্ত ওর সঙ্গে দেখা নেই। সেই সময় মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখনকার মতো অতটা সহজলভ্য ছিল না। গ্রামজুড়ে দু'একটা বাড়িতে থাকত বিশাল অ্যান্টেনা। দেখে বুঝে নিতাম টিভি অথবা মোবাইলের হবে। আর তখনকার দিনে যার হাতে মোবাইল থাকত, সে তো এ যুগের ভিআইপির থেকেও বেশি কিছু। আমার বাবার কোনো মোবাইল ছিল না। আমার তো প্রশ্নই আসে না।

প্রকৃতির বাবার টিঅ্যান্ডটির সংযোগ ছিল। কিন্তু সে সংযোগের নম্বরটা ছিল না। থাকলে আজ সহস্র মাইল দূরে থাকলেও কাছে থাকা যেত। বন্ধুদের মধ্যে সজলের বাবার ফোন ছিল। এ সুবাদে প্রকৃতির সঙ্গে ওর যোগাযোগ হয়। মাঝে মধ্যে আমিও সজলদের ফোন থেকে কথা বলতাম। সজল যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে প্রকৃতির ফোন নম্বর দিয়ে গেলেও আমার ফোন না থাকায় যত্ন করে আর রাখা হয়নি। হারিয়ে ফেলি দেখা হওয়ার শেষটুকু অবলম্বন।

দেখতে দেখতে সময় অনেক গড়িয়েছে। এখন আমার ফোন-মোবাইল দুটোই আছে। আছে ইন্টারনেট সংযোগ। চাইলে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে সংযোগ স্থাপন করতে পারি। কিন্তু সঙ্গে যে ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। তখন সময় ছিল ব্যস্ততা ছিল না এমন। আজ সংযোগ আছে কিন্তু সময় নেই। আছে শুধু স্মৃতিঘেরা দিন।

আজ প্রকৃতিও হয়তো তার মতো ভালো আছে। স্বপ্নকথাটা মনের কোণে নিঃশেষ হয়ে গেল। প্রকৃতি যে আমার কাছে বন্ধুর চেয়েও একটু বেশি ছিল। হাসি হাসি মুখটা এখনও চোখের তারায় ভাসে। প্রিয় মানবী এখনও আছে। এখনও আছে ঠিক বুকের বাম পাশে। া