সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


শেষ আশ্রয়

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

ইরফান তানভীর

এতিমখানা থেকে পালিয়ে এসেছে রাশেদ ও তার বন্ধু রাফি। নারায়ণগঞ্জের যে এতিমখানাটিতে তারা পড়ছে, সেখানে আজ বার্ষিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান উপলক্ষে এতিমখানা দুপুর থেকে ছুটি। ছাত্ররা যে যার মতো আপন কাজ করছে। কেউ কেউ স্টেজ সুন্দর করা নিয়ে ব্যস্ত। রাশেদ আর রাফি দেরি করেনি। ট্রাঙ্ক থেকে ধোয়া জামাটা পরে সোজা সদর দরজার মুখ থেকে মেইন সড়কে। পথ চলতে চলতে প্রচণ্ড ক্ষুধাও পেয়েছে তাদের। হাতে অবশ্য কিছু টাকা আছে। গতকাল বিকেলে একজন সাহেব এসেছেন এতিমখানায়। তার মরহুম বাবার রুহের মাগফিরাত কামনায় তিনি নিজ হাতে এতিমদের প্রত্যেককে দুইশ' টাকা দিয়েছেন।

নিশ্চুপ দুটি নিথর প্রাণের মতো তারা উদ্দেশ্যহীন হয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। আকাশের গনগনে রোদটা তখন নেতিয়ে পড়ছে। গত তিন বছর আগে রাশেদের এক কাকা রাশেদকে এ এতিমখানায় দিয়ে যান। তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ, এখন সতেরো। অনেক কিছু সে বুঝতে পারে। তার বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা যান, সেদিন তাকে কত মানুষ সান্ত্বনা দিয়েছে! ঘরভর্তি মানুষ মাথায় হাত বুলিয়ে বড় বড় স্বপ্নের কথা বলেছে। অথচ আজ তিন বছর ধরে এতিমখানায় আছে। তিন মিনিট সময়ের জন্যও কেউ দেখা করতে আসেনি। সেসব কথা ভাবতে গেলেও রাশেদের গা অবশ হয়ে আসে। রাশেদ স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়ায়। বাবা স্টু্কল শিক্ষক ছিলেন। রাশেদ একমাত্র সন্তান। সারাটা ঘর আনন্দে খলবল করত। বাবা মারা যাওয়ার ছ'মাস পর এক আকাশ কষ্ট নিয়ে মাও পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

রাশেদ এতিমখানা থেকে পালিয়ে এসেছে ঠিক, কিন্তু সে কোথায় যাবে, তা সে জানে না। তার মনে হলো তার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

রাশেদ আর রাফি একই দিনে এতিমখানায় এসেছে। রাশেদের দুঃখ-সুখের সব গল্প রাফির জানা। রাফিকে দেখার পর রাশেদের মনে হয়েছে- পৃথিবীতে ভালো বন্ধু আর ভালো মানুষ এখনও অবশিষ্ট আছে। সে অবাক হয়। রাশেদ চোখ বুজে অনুভব করে ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু! সে পারে না, মানুষ কোনোদিন দুঃখ আর ভালোবাসার পরিমাপ করতে পারে না। রাশেদও পারে না। গরম পরটা ভাজি খেতে খেতে রাশেদ রাফির চোখ দুটির দিকে তাকায়। মেলায় বাবাকে হারিয়ে ফেলা ছোট ছেলে যেমন অসহায় দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে তেমন দেখাচ্ছে। কিরে রাফি, কই যাবি এখান থেইকা? সন্ধ্যা তো হইয়া আসলো! রাফি ধরা গলায় বলে, তুই কই যাবি?

আমি কই যামু, আমার তো পরিচিত কেউ থাকে না এখানে! যারা গ্রামে আছে তাদের তো যোগাযোগই নেই। রাশেদের চোখটা অশ্রুভারে ভিজে উঠল। রাফির এক মামা ঢাকায় আছে, সেও বলল যে মামা এদ্দিন খবর নেয় নাই, তার কাছে যামু না। মরলেও না!

মিনার থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। শহরের কাকেরা ছোটাছুটি করছে কোথাও আড়াল হতে। এরই মধ্যে সূর্য পুরোপুরি গা-ঢাকা দিয়েছে পশ্চিম আকাশের বুকে। আরেকটু পর অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে পুরো আকাশ ছেয়ে যাবে।

রাশেদরা দেখল তাদের একটি জায়গায় যাওয়ার অনুমতি আছে। সে জায়গাটি কেমন মায়াভরা আকুলতা নিয়ে তাদের ডাকছে। এত না থাকার মাঝেও কী অদ্ভূত রকম মায়া নিয়ে রবিউল স্যার যেন তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। দোকান থেকে বেরিয়ে তারা বড় কদমে পা ফেলে এতিমখানার পথ ধরে হাঁটতে লাগল। পেছনে অসংখ্য মানুষ, তবুও তাদের এ একটি জায়গা ছাড়া যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।া