সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


প্রযত্নে প্রিয় মানুষ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২০      

ইরফান তানভীর

হলুদ একটা খাম। এর ওপর ছোট অক্ষরে লেখা- প্রযত্নে প্রিয় মানুষ। এর শেষে খুব সংক্ষেপে মনপুরার এই বাড়ির ঠিকানা। সুরাইয়া চিঠির এ খামটা হাতে নিয়ে চমকে উঠল খানিকটা। খামটা খুলতে তার ভয় হচ্ছে। এমনটা কি সব মানুষেরই হয়? এমন বেনামি উড়োচিঠি সে কখনও পায়নি! ভেতরে কী লেখা?

মানুষ কখনও কখনও ভাবনার চেয়েও বেশি কিছু পেয়ে যায়। তখন সে মানুষটি না আনন্দ, না সুখ- এমন মিশ্রণ সময় পার করে। সুরাইয়ারও এমন হচ্ছে। আসরের আজান হচ্ছিল তখন। সাইকেল থেকে নেমে ডাকপিয়ন চিঠিটা সুরাইয়াকে দিয়ে গেছে। মাগরিবের আজান এখনও হয়নি। তবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সুরাইয়া এখনও পলকহীন চোখে হলুদ রঙের খামটার দিকে তাকিয়ে। সে মনে করতে লাগল, না তো, সে তার ২৪ বছরের এ বয়সটায় কারো প্রিয় হতে পারেনি!

তার মনে পড়ে, লালমোহন কলেজে পড়াকালীন বিদায় অনুষ্ঠানে প্রিন্সিপাল স্যার সবাইকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা! আর একটা মানুষ তাকে খুব প্রিয় বলে চিঠিপত্র লিখত! সে কাওসারও একদিন অপ্রিয় সত্যের মতে চলে গেছে। কাওসার কেমন আছে এখন? আচ্ছা সে চিঠি লিখেনি তো আবার! সুরাইয়ার হূৎপিণ্ডটা ধুকপুকুনি শুরু করে দিয়েছে। কাওসারকে তার কখনও মনে হয়নি সে হাত থেকে ফসকে যাবে। কিন্তু মানুষ সব সময় যা ভাবে বাস্তবে হয় তার উল্টোটা। এমন কেন হয় সুরাইয়া জানে না! জানারও ইচ্ছা নেই। টুম্পা মিটমিট করে হাসছে। তার হাসিটা বড় বোন সুরাইয়াকে ভীষণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলল।

তখনও পুরোপুরি রাত হয়নি। সম্ভবত প্রথম প্রহর চলছে। সুরাইয়া হলুদ খামটা নিয়ে হারিকেনের সামনে মুখ করে বসল। প্রচণ্ড শীতের রাতেও সুরাইয়ার ফর্সা কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘামের রেখা নামছে। টুম্পা শুয়ে গেছে এতক্ষণে। বাইরে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। সুরাইয়া খামের ওপর লেখাটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে খামটা হাত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। খুব সস্তা দামের কাগজ। দুটি পাতার প্রথম পাতায় একটা গোলাপ ফুল আঁকা। দ্বিতীয় পাতার ঠিক মাঝখানে লেখা- কেমন আছ সুরা? আমি ভালো নেই। চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে আমার। মনে আছে, তোমার খুব গোলাপ পছন্দ ছিল... বহুদূরে আছি। তাই কাগজে গোলাপ এঁকে দিলাম। ইতি...

একটা অসম্পূর্ণ চিঠি পড়ে সুরাইয়ার ভেতরে প্রচণ্ড রকম ঝড় বইতে লাগল। লোকটা তার নাম গোপন রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সুরাইয়ার বুঝতে দেরি হয়নি এটা কাওসারের লেখা। কাওসার। আচ্ছা কাওসারের কী হয়েছে?

সুরাইয়া এমন কনকনে শীতের রাতে প্রচণ্ড ঘেমে গেছে। ৩ বছর আগে মাত্র চার মাসের নতুন সংসার রেখে ফুড়ূত করে উড়ে গেছে কাওসার। যে কাওসারকে সুরাইয়া পৃথিবীর সব থেকে বেশি ঘৃণা করত, অথচ সে কাওসারের বেনামি উড়োচিঠিতে তার ভালো না থাকার খবর সুরাইয়াকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। ভীষণ যন্ত্রণায় তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে আসছে।

যে মানুষ একদিন অপ্রিয় হয়ে যায়, তার জন্যও এক সময় প্রিয় অনুভব হৃদয়ে ভিড় করে। সুরাইয়া চিঠির ওপর লেখাটায় হাত বুলাতে বুলাতে দেখল, তার অশ্রুতে গোলাপ ফুল আঁকা ছবিটা ভিজে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে কাগজের ভেতর। া