অপুর ডান হাতটা বেশ ফুলে গেছে। পিনপিন করে ব্যথা করছে। হয়তো মচকে গেছে। শরীফের ব্যথাটা অবশ্য পায়ে। সামান্য কেটে গেছে। কাল্লু গুন্ডার হাত থেকে বাঁচতে পেরে অপুরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ব্যথার কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। জোয়ার্দার বাড়ির এই কুকুরটা বীভৎস রকমের হিংস্র। কুচকুচে কালো রঙের বলে সবাই তাকে 'কাল্লু' বলে ডাকে। গত সপ্তাহে রতন চোরাকে কপোকাত করার পর থেকে রসুলপুর গ্রামের সবাই তাকে 'কাল্লু গুণ্ডা' উপাধি দিয়েছে। দৌড়াতে দৌড়াতে সবাই অপুদের বাড়ির পেছনের আমগাছের তলায় জড়ো হলো। সবাই হাঁপাচ্ছে।

- কী রে শরিফ, মাল কই?

- তুই আছোত- তর মালের চিন্তা লইয়া! আল্লায় যে জানে বাঁচাইছে শোকর কর।

- তাইলে ?

- দাঁড়া। কী করণ যায় দেখতাছি।

'জাগো গ্রামবাসী। জোয়ার্দার বাড়িতে চোর পড়েছে'- বলে দক্ষিণপাড়ার মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিচ্ছেন ইমাম সাহেব। মনটা একটু খচমচ করে উঠল অপুর। ওইদিকে স্কুলের মাঠে অপেক্ষা করছে জহিররা। এখন জহিরদের কীভাবে মুখ দেখাবে তারা! উভয় সংকটে পড়েছে সবাই।

অপুরা রসুলপুর গ্রামের সুপরিচিত বিচ্ছু বাহিনী। সবাই তাদের সম্পর্কে জানে। পাশের শ্রামের হাইস্কুলে পড়ে তারা। দুরন্ত ও ডানপিটে দল তাদের। চোরের খবর শুনে লাঠিসোটা নিয়ে মোটামুটি গ্রামের সবাই ঘর খালি করে বাইরে চলে এসেছে। আজকে আর সম্ভব নয়। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই অপুরা যার যার বাড়ি চলে গেল। সূর্যটা সবেমাত্র ডিমের কুসুমের মতো রঙ ধরতে শুরু করেছে। আরও একটু সময় লাগবে আলো ফুটতে। অপুর দরজায় কড়া নাড়ছে সুন্দর আলী। তার হাতে তাল কাঠের রুল। তেল চিটচিটে রুলটাও মনে হচ্ছে সুন্দর আলীর মতো দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে! কলিমউদ্দিন জোয়ার্দার তাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। সেই খবরটা দিতে এসেছে। স্কুলের অফিস কক্ষে সালিশ বসেছে। হেডমাস্টার মোহন বাবুও সালিশে উপস্থিত আছেন। অপু অফিসে ঢোকার সময় দেখল, মাঠের কোণে জহিররা কলাগাছ দিয়ে সুন্দর একটা শহীদ মিনার বানিয়েছে। তার মনটা খুশিতে নেচে উঠল। লাল, নীল, সবুজ কাগজের নিশান কেটে সাজানো হয়েছে শহীদ মিনার। অপুর পেছন পেছন শরীফ, তমাল, রুমেল, শাহিন ও নুরু অফিসে ঢুকল। রাগে গজগজ করছে জোয়ার্দার। হেডমাস্টার সাহেবের চোখেও আগুনের গোলা দেখা যাচ্ছে। জোয়ার্দার বাড়িতে চুরি করার জন্য তিন হাত কলিজা লাগে! সেই কলিজাই কিনা দেখাল এই পুঁচকে বাহিনী! মোহন বাবু অপুকে ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'অপু, জোয়ার্দার সাহেব যা বলছেন- ঘটনা কি সত্যি?' অপুরা কেউ কথা বলছে না। মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। মোহন বাবু এক ঝটকায় উঠে আলমারি থেকে লাল স্কচটেপ পেঁচানো একটা বেত দোলাতে দোলাতে অপুর দিকে মারতে যাচ্ছেন। এমন সময় জোয়ার্দার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং হেডমাস্টার সাহেবকে থামতে বললেন। এত বড় ঘটনার এই ছোট শাস্তি হতে পারে না! তাদের জন্য আরও বড় শাস্তি জোয়ার্দার নিজেই বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। 'সুন্দর আলী, জিনিসটা নিয়ে আয়তো'। উচ্চৈঃস্বরে ডেকে বললেন। হেডমাস্টার সাহেব তাকিয়ে আছেন জোয়ার্দারের দিকে। অপুদের মনে এই প্রথম আজ ভয়টা জেঁকে বসেছে। তাদের কপালে যে আজ কী আছে!

সুন্দর আলী খুব সুন্দর একটা ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে অফিসে ঢুকল। বেশ বড়। জোয়ার্দারের গোঁফের নিচে একটা দুষ্টু হাসিতে কৌতুক খেলা করছে। নব্বই দশকের ক্যাসেটের সেই ফিতার মতো ঘটনার মাথামু ু সব পেঁচিয়ে গেছে। কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

- তোদের শাস্তি হলো তোরা প্রভাতফেরিতে ফুলের তোড়াটা নিয়ে সামনে সামনে হাঁটবি। আর আমরা বুড়োরা তোদের পেছনে পেছনে হাঁটব। আরেকটা শাস্তি আছে- আগামী জুমাবার এই স্কুলের শহীদ মিনারের কাজ শুরু করব। তোদের তখন স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করতে হবে। যাদের বুকে ভাষা শহীদদের জন্য এতটা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাদের কি এত সহজে ছাড়া যায়! কী বলেন, মাস্টারমশাই? স্যালুট তোদের।

জোয়ার্দার সাহেবের কথা শুনে মোহন বাবুও ভড়কে গেলেন। অপুরাও বোকার মতো হাসছে। সুন্দর আলী দরজায় দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসছে।

- এবার কিন্তু তোদের চুরি করা ফুল দিয়ে আমি আর সুন্দর আলী এই ফুলের তোড়া বানিয়েছি। আগামীবার তোরা বানাবি। নে চল- প্রভাতফেরি শুরু করা যাক।

সবার মুখে মায়ার হাসি। জোয়ার্দার নিজে প্রভাতফেরির গানে টান দিতেই সবাই সমস্বরে গাইতে শুরু করল, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।'

মন্তব্য করুন