একটা ফোনকলের আঘাতেই বিধবা হয়ে গেল রুমানা! সারাদিনের কর্ম সেরে অন্নযোগে প্রবৃত্ত হতে বেলা হেলে পড়ে পশ্চিমাকাশে প্রতিনিয়ত রুমানার। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। অবরবেলায় দুটো খাবারের আয়োজন করছিল রুমানা। মানুষ আয়োজন করে, বিধাতা যদি সে আয়োজন ভঞ্জনের আয়োজন করে, শত চেষ্টাতেও তা বৃথা হয়ে যায়! ভাতগুলো মেখে মাত্র মুখে নিতে যাবে, সেখানেই ছেদ ঘটে তার অশুরু তৃপ্তাহার! সেই দুর্দমনীয় খিদে মুহূর্তে উদ্বায়ু হয়ে গেল। দেহাঙ্গ কাঁটাঘাতে ব্যথিত হয়, আর যদি সে অঙ্গ একবারেই কাটা পড়ে তার ব্যথা আরও দুঃসহ আরও বৃহত্তর। ছোট দুঃখ আত্মসমর্পণ করে বড় দুঃখের কাছে।

আজ ভরদিন ফোন দেয়নি জমির। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত নিয়ম করে ফোন দেয় জমির তার সর্বসঙ্গী সহধর্মিণীকে। সংসারের আর দশটি নিয়মের মতো এটিও রুমানার নিত্যকার নিয়ম। কখন গৃহস্থালির কোন কাজটিতে হাত দিতে হবে, কখন ছাগপালের মুখে দুটো পাতা-পানি তুলে দিতে হবে, হাঁস-মুরগি খেল কি খেল না, ঘরের কানাচের মানকচুটি কেমন মোটা হয়েছে তার খোঁজ নেওয়া, উঠোনের সন্নিকটে শিম গাছ, পুঁইশাক ও লাউয়ের মাচায় ঢুঁ মারা- এসবের সঙ্গে জমিরের ফোনাহবান যেন এক তাল-লয়ে নিরত নিত্য করে চলে রুক্সিনির জঙ্গম জীবনে। সেও তালে তাল দিয়ে চলে সমানে; পৌনে দুই বছরে ফোন দিয়ে জমির রুক্সিকে পায়নি, এমন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আজকে সকালের সূচনা নিয়মের বরখেলাপে! আত্মা প্রেমার্পণ করলে অলিখিত-অব্যক্তেয় একটি যোগাযোগ সূত্র রচিত হয়, যেখানে এক প্রান্তে টান পড়লে অপর প্রান্তও অনুরণিত হয়।

বিদেশ-বিভূঁইয়ে গমনের আগে খুব করে একটি সন্তানের আবদার করেছিল জমিরের কাছে রুমানা। জমির বলেছিল, 'রুমানা, আমাদের যে সন্তান হবে, সে আজন্ম তার পিতা-মাতা উভয়েরই স্নেহ-মমতা পাক, এ আমার বিরাট চাওয়া। সন্তান জন্ম দেওয়াটা তো দায়সারা গোছের হতে পারে না।' আনত ঝাপসা নয়নে জমিরের হাত ধরে সে বলে, 'তবে তুমিহীনা কেমনে কাটবে আমার দুর্বিষহ সময়?' 'রুমানা, এ কয়টি বছর না হয় আমরা প্রেম করে কাটিয়ে দেব। আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে প্রেম করার সৌভাগ্য শূন্য, স্বস্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করে এই শূন্যকে পূর্ণ করতে চাই।' 'যে বিষয়টা সৌভাগ্য জ্ঞান কর তা থেকে কেন বঞ্চিত হতে গেলে?' 'এটা বঞ্চিত নয়, রুমানা বলতে পার সঞ্চিত। যার এক এবং একমাত্র প্রাপ্য তুমি'- বলে রুক্সিকে বাহুযুগলে বন্দি করে নাক দিয়ে নাকে মৃদু টোকা দিল। রুমানা দ্বিতীয় কোনো কথা বলেনি, জমিরের চোখের পানে একজোড়া ছলছল চোখ তুলে শুধু বলেছিল, 'তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো।' জমিরের এই দুটি কথা রুমানাকে সামনে থেকে আহ্বান করে চলেছে, দেহ-মন সকল সমর্পণ করে সে কেবল সে আহ্বানেরই অনুসরণ করে চলেছে। জমিরের অবর্তমানে তার হৃদয়াঞ্চলে প্রশান্তির হিল্লোল বয়ে আনে প্রণয়ের সেই অমৃতালাপ আর স্বামীর প্রতি নিবিড় টান। সেই টানের সুতো কেটে গেল যার গোড়া প্রগ্রন্থিত ছিল হৃদয়মূলে।

জমিরহীন রুমানার দু'দিন কাটল। এমন বহু দু'দিন গেছে রুক্সির, যেখানে জমির ছিল না। কিন্তু এ দু'দিন সকল দু'দিন থেকে আলাদা। দুনিয়ার সব নিয়ম ফাঁকি দিয়ে রুমানার জীবন-ক্যালেন্ডারে কে যেন শূল বিদ্ধ করে রেখেছে; হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ও সময়ের চিরস্থবিরতায় মুমূর্ষু রুক্সি হাঁসফাঁস করতে লাগল। এ দু'দিনে তাকে কেউ কিছু মুখে দিতে পারিনি! সে ক্ষুধা-তৃষ্ণা, অনুভূতি-অনুরাগ, ইন্দ্রিয় ক্রিয়াকলাপ সব কিছুর অপলাপ করে জীবন্মৃত বেঁচে আছে! ক'দিন আগেও যে বৃক্ষটি সফুলাভিরাম তরতাজা প্রাণবন্ত-প্রাণসঞ্চারী ছিল, বিনা জলসিঞ্চন, বিনা যত্নে তা আজ ম্রিয়মাণ প্রসূন-পাতায় কোনো রকম দাঁড়িয়ে ধুঁকছে; অপেক্ষা শুধু মহাকালে বিলীন হওয়ার!

প্রাণবিসর্জনের দিন সাতেক পর একটি সফেদ যান এসে দাঁড়াল জমিরের বাড়ির উঠোনটার ঠিক মাঝখানটায়, যার গায়ে লাল কালিতে লেখা- 'লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি'। জমিরের ঘরের ম্রিয়মাণ প্রদীপটি ধপ করে জ্বলে ওঠে নিমিষেই নিভে গেল!

মন্তব্য করুন