বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিতর্ক উৎসবের চূড়ান্ত পর্যায়ে তরুণ বিতার্কিকদের উৎসাহ দিতে এসেছিলেন বিশিষ্টজন। বিতর্ক শোনার পাশাপাশি মেধাবী এই প্রজন্মের জন্য তারা দিয়ে গেছেন আগামী দিনের পথচলার পাথেয়। তাদের বক্তব্যের চুম্বক অংশ পত্রস্থ হলো...

অধ্যাপক মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া
উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


আমাদের ছেলেবেলায় সব স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানো হতো না কিন্তু বিজ্ঞান পড়ার নেশা ছিল। কষ্ট করে নদী পাড়ি দিয়ে দূরের স্কুলে গিয়ে বিজ্ঞান পড়েছি। সেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখেছি শহরে এসে কলেজ পর্যায়ে। আমরা চাই গ্রামে-গঞ্জে যত স্কুল-কলেজ রয়েছে, সবখানে যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখতে পারে। প্রতিটি মুহূর্তে যে বিষয়টির সুফল আমরা ব্যবহার করি তা হলো বিজ্ঞান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে বিজ্ঞান। তাই বিজ্ঞানচর্চার কোনো বিকল্প নেই। আমি অবাক হয়েছি, আজ এই আসরে বিজ্ঞান নিয়ে এই বিতর্কে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া সব বিতার্কিকই নারী। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন আমাদের পাশে একজনও মেয়ে ছিল না, আর এখন কৃষিশিক্ষায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নারী। তারা সর্বত্র এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে আছে, নেই কেবল বিজ্ঞানের চর্চা। গবেষণা-চর্চার কালচার আমাদের নেই। এই যুগে এসেও আমরা খুঁজছি বিজ্ঞানের মেধাস্বত্ব কী! যেখানে সারাবিশ্ব বিজ্ঞানে অনেকটা পথ এগিয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের বিজ্ঞান শিক্ষা লাভ করবে, বিজ্ঞানে এগিয়ে যাবে সেটি আমাদের প্রত্যাশা।

ড. রেজাউর রহমান
ট্রাস্টি, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন

ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। বিজ্ঞান নিরন্তর অনুসন্ধান করে যায়, আবিস্কার করে যায়, সাধারণত কোনো বিতর্কে যায় না। ধর্ম পাশাপাশি চলছে, অনাদিকাল থেকে আছে, থাকবে। এই আসরে অল্প বয়সী বিতার্কিকরা যে জ্ঞান-গরিমার পরিচয় দিয়েছে এবং যে বিষয়টি নিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছে, তা আজকে আমাকে যেটি বিস্মিত করল এবং যা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এই খুদে শিক্ষার্থী অবশ্যই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে বিতর্কের বিচারকরা তাদের সূক্ষ্ণ বিচারশক্তি, মননশীলতা ও দূূরদৃষ্টির মাধ্যমে সুচারুরূপে বিচারকার্য পরিচালনা করল এবং শিক্ষার্থীদের ত্রুটিবিচ্যুতি ধরিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিলেন এটি অত্যন্ত জরুরি। অত্যন্ত সুন্দর ও গঠনমূলক এ আয়োজন অনাদিকাল পর্যন্ত চলবে এটি আমার প্রত্যাশা। শুধু বিজ্ঞান নয়, শুধু ধর্ম নয়, এর পাশাপাশি অনেক বিষয় এই বিতর্কের মাধ্যমে উঠে এসেছে, যা শোনার মতো, মনে রাখার মতো। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যারা যুক্ত সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সমকাল

আমরা বিজ্ঞানমনস্ক, উদার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এটি এ প্রজন্মই করতে পারবে। আমাদের সময় যে সুযোগ-সুবিধা ছিল না তা এ প্রজন্মের আছে, তারা বিজ্ঞানকে, পুরো পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘোরে। বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ ও জাতি গড়ে তোলার জন্য আট বছর ধরে সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। বিজ্ঞান শিক্ষায় আমরা অনেকটাই এগিয়েছি, আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। স্কুল পর্যায়ে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আজকের এই আলোকিত ছাত্রীরাই পারবে তাদের স্কুলকে, সমাজকে বদলে দিতে; যা তারা শিখেছে, যা বলেছে, তা যেন তারা বুকের ভেতরে ধারণ করে। আমরা শুধু কয়েকজন বিজ্ঞানী তৈরি করতে চাই না, পুরো সমাজকেই বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে চাই। নতুন প্রজন্মের কাজ থেকে নতুন চিন্তা, নতুন বক্তব্য পাওয়া যায়। এই প্রজন্মের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।

জসিম উদ্দিন
সম্পাদক, প্রফেসর'স কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

আজকের চূড়ান্ত আসরের শেষ বিতর্ক দেখে আমি খুবই আনন্দিত; কারণ দুটি দলই নারী শিক্ষার্থীর। কন্যা, নারী, মায়েদের জয় হোক, তোমাদের অভিনন্দন! অভিনন্দন! অভিনন্দন! শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প নেই। সমাজের কুসংস্কার ও মুক্তমনা মানস গড়ে তুলতেও বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানবিষয়ক যুক্ততর্ক অত্যন্ত ইতিবাচক। কেননা বিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে যুক্তির কথা বলে। আমাদের জীবনের সবকিছুতেই রয়েছে বিজ্ঞানের ভূমিকা। কারণ জীবনটাই একটি সায়েন্স। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে বিজ্ঞান। বিতর্কের মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছানো যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, তর্কের খাতিরে তর্ক নয়, তর্ক হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক। আমরা এমন সুস্থ ধারার বিতর্ক চাই, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সুনাগরিক হিসেবে দেশ গড়ে তুলবে, ভবিষ্যৎ সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। বিজ্ঞানমনস্ক হয়েই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে এই বিতর্ক ধারার মধ্য দিয়ে। তারা আমাদের দেশ ও জাতিকে সব ধরনের কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্তি দেবে।

সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন

এ আয়োজনটি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার্থী তৈরির আন্দোলন। করোনা মহামারির সময়েও আমরা ৬৪ জেলার ৫২০টি স্কুলকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের উৎসবগুলো সফলভাবে আয়োজন করতে পেরেছি। ঢাকার বাইরের জেলার যে দুটি দল আমাদের চমৎকার বিতর্ক উপহার দিল তাদের অনেক অনেক অভিনন্দন ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শুভকামনা। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঢাকা ও প্রধান শহরের স্কুল ছাড়া অনলাইনে দক্ষতা ও কারিগরি দুর্বলতার ক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও এ আয়োজনের মতো সহশিক্ষা কর্মকাণ্ডগুলো শিক্ষার্থীদের কী পরিমাণ উজ্জীবিত করেছে, এটা আমরা যারা মাঠে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেছি এবং যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্পর্শে গিয়েছি সেটা বুঝতে পেরেছি। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, বিজ্ঞানাগার, ল্যাব ও কম্পিউটার অব্যবহূত থাকায় নষ্ট হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিকভাবে কীভাবে মেইনইস্ট্রিমে নিয়ে আসা যায়, শিক্ষার্থীরা সব সুযোগ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা আশাবাদী, ২০২৩ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হচ্ছে। আমরা এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। একমুখী শিক্ষার মাধ্যমে একটি বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি গঠন করতে পারি। আজকের আয়োজনে উপস্থিত বিতার্কিক, অভিভাবকসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে বিএফএফের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং বিশেষভাবে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি শারীরিক অসুস্থতার পরও আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, তিনি শত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বিজ্ঞানের জয় হোক, বিতর্কের জয় হোক।

মাহবুব আজীজ
ফিচার সম্পাদক, সমকাল

উদার, গণতান্ত্রিক পত্রিকা হিসেবে সমকাল তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে- তারই ধারাবাহিকতায় এই বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আমাদের সব আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নৈতিক ও উদার সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামীর ভবিষ্যৎ, তাই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িকতা বিষয়গুলো আমরা তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিতর্কের মাধ্যমে চর্চার জায়গা করে দিতে চাই। যাতে তারা আগামী দিনে একটি অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক, সুন্দর, যৌক্তিক, মানবিক ও নৈতিক সমাজ উপহার দিতে পারে। ২০১৩ সাল থেকে আমাদের এ আয়োজন নিয়মিত চলছে। দীর্ঘ এ সময়ে একটি জেনারেশন তৈরি হয়ে গেছে, যারা যুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ায় এ আয়োজনের সঙ্গী হয়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পাশে থাকলে আমরা আরও নানা আয়োজনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কোনো বিকল্প নেই। আমরা কথা বলব, আমরা কথা শুনব, আমরা প্রত্যেক মানুষকে একই চোখে দেখব, এই স্বপ্ন সবার মধ্য ছড়িয়ে যাবে- সমকাল এ লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে, আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

মন্তব্য করুন