সবার দৃষ্টি ছিল ঘোষণা মঞ্চের দিকে। শেষ লড়াইয়ে কে বিজয় মুকুট নিয়ে নিজ জেলায় ফিরবে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিজয়ী দল হিসেবে ঘোষণা হলো কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম। মুহূর্তে পাল্টে গেল পরিবেশ। করতালিতে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেন সবাই। অবসান ঘটল দীর্ঘ কয়েক মাসের অপেক্ষার পালা। শেষ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার তীব্র প্রতিযোগিতায় মেতেছিল বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দলের মেধাবী বিতার্কিকরা। 'বিজ্ঞানমুখী শিক্ষাই পারে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গড়তে' শীর্ষক প্রস্তাবের বিপক্ষে বিজয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরেছে নবাব ফয়জুন্নেছা স্কুলের বিতার্কিকরা। এ দলের দলনেতা সালফিয়া তানহিয়াত নুজাইমা সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠ বক্তার সম্মান। এ অর্জন করতে কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকরা ভূমিকা রেখেছেন। বিতার্কিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের সফলতার নানা কথা।

২৭ মার্চ সিলেটের প্রতিযোগিতায় হবিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে হারিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে এবং পরে অনলাইনে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যুক্ত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে সেমিফাইনালে উঠে বিজয়ী এ টিম।

দলনেতা সালফিয়া তানহিয়াত নুজাইমা নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। ভবিষ্যতে সে চিকিৎসক হতে ইচ্ছুক। ছোটবেলা থেকে উপস্থিত বক্তব্য, আবৃত্তি ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়েছে সালফিয়া। সালফিয়া জানায়, তার টিমকে বিজয়ী করতে তাদের কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছে। শিক্ষকদের পাশাপাশি তার মা-বাবা তাকে

সার্বিক সহায়তা করেছেন। প্রতিপক্ষকে যুক্তিতর্ক ও তথ্য দিয়ে ঘায়েল করতে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। আমাদের টিমকে বিজয়ী হতেই হবে- এমন সংকল্প থেকে আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করি। নিয়মিত শিক্ষকরা এসব বিষয় মনিটর করছেন। বাসায় গিয়েই আমরা ৩ জন সার্বক্ষণিক যোগাযাগ রাখি। সালফিয়া জানায়, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ৩ জনের টিমের মধ্যে একজন কোনো কারণে বক্তব্যে লাইনচ্যুত হলে পরাজয় নিশ্চিত। তাই মনোবল ঠিক রেখেই মঞ্চে দাঁড়াতেই হয়, আমরা এতে সফল হয়েছি। অনেক ভালো লেগেছে। আগামীতে পথচলার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে এটি।

সুমাইয়া তাসনিম বিন্তী বিজ্ঞান বিভাগে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। ভবিষ্যতে সে চিকিৎসক হতে ইচ্ছুক। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকায় পারদর্শী বিন্তী অনলাইনে একাধিকবার সংসদীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেছে। বিন্তী জানায়, এমন বিজয় আশা জাগায়। সমকাল-বিএফএফ বিতর্ক উৎসবে জেলা পর্যায়ে বিজয়ী হয়ে তাদের টিম সিলেট গিয়েও বিজয়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার পর আরও কঠোর অনুশীলন করি। শিক্ষকরা উৎসাহ দিতেন। অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। ছোট কাগজে তথ্য লিখে কখনও স্কুলে, কখনও বাসায় বসে নিজে নিজে বক্তব্য দেওয়ার চর্চা করি। সে আরও জানায়, কুমিল্লা থেকে সিলেট, এরপর অনলাইন এবং চূড়ান্ত উৎসবে কখনও কোনো তথ্য নিয়ে হতাশ হতে হয়নি, প্রতিপক্ষ টিমকে যুক্তিতর্ক ও তথ্য দিয়ে আমরা ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছি।

দলের অন্য সদস্য ফারহা ইসলাম একই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের নবম শ্রেণির ছাত্রী। ভবিষ্যতে চিকিৎসক পেশায় যেতে ইচ্ছুক ফারহা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে এর আগে বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ২০২০ সালে জেলা পর্যায়ে দুদক আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়। ফারহা জানায়, রাজধানীতে গিয়ে কোনো বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তার এবারই প্রথম। তাই টেনশন তো ছিল বেশ। কী যেন হয়। চূড়ান্ত আসরে শিক্ষামন্ত্রী থাকার কথা ছিল; তাই টেনশন আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নানা পরামর্শে দিনরাত পড়ালেখা বাদ দিয়ে শুধু অনুশীলন করি। তাই আমাদের সফলতাও আসে। সবার মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি এটাই অনেক বড় বিষয়।

নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রোকসানা ফেরদৌস মজুমদার বলেন, এমন একটি বড় আয়োজনের জন্য সমকাল ও বিএফএফকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় আনন্দের বিষয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো আয়োজনের ব্যবস্থাপনা ছিল প্রশংসনীয়। ঢাকা থেকে সুহৃদরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও এমন ভালো উদ্যোগের সঙ্গে আমরা আছি।

কুমিল্লা প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন