বাংলাদেশ পোস্ট অফিস সব শ্রেণির মানুষকে সহজ, নিরাপদ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ডিজিটাল লেনদেন সেবা দিতে চালু করেছে 'নগদ'। মোবাইল ফোনে মানি ট্রান্সফার ব্যবস্থা বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাশ্রয়ী সেবা দিয়ে শুরু থেকেই আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। নগদের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

সমকাল :আর্থিক লেনদেনের জন্য অনেক ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকার পরও ডাক বিভাগকে মোবাইল লেনদেন ব্যবস্থায় আসতে হলো কেন?

তানভীর এ মিশুক :বর্তমান সরকার দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সবাইকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে হবে। মফস্বল ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা ব্যবসার ছোট উদ্যোগগুলোকে এ ধারায় আনতে হবে। সবাইকে মূল অর্থনৈতিক স্রোতধারায় আনার প্রথম ধাপ হলো- সহজে লেনদেন করার সুযোগ তৈরি করা। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিতে পারছে না। এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলেও সব প্রান্তে পৌঁছায়নি। প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে সেটির দরকারও নেই। আবার মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলেও অনেকের নিরাপত্তা আধুনিক নয়, তা ছাড়া ব্যয়বহুল। সুযোগ বুঝে কেউ কেউ একচেটিয়া ব্যবসা করছে। ফলে সবাইকে অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ সীমাবদ্ধতা দূর করতেই নতুন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা নগদ চালু করেছে বাংলাদেশ পোস্ট অফিস।

সমকাল :ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থাকায় 'নগদ' দিয়ে আলোচনা আছে।

তানভীর এ মিশুক :আসলেই কি তাই? দেখুন, নগদ বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের, অর্থাৎ সরকারের উদ্যোগ। ২০০ বছর আগে দেশে যখন কোনো ব্যাংক ব্যবস্থা ছিল না, তখন পোস্ট অফিস ছিল। 'দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট ১৮৯৮' আইনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হচ্ছে, যা 'মানি অর্ডার' হিসেবে জানি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ আইনে মানি অর্ডার বলবৎ আছে। নগদ হলো মানি অর্ডারের ডিজিটাল ভার্সন। তা ছাড়া নগদের লেনদেন সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বিআইএফইউতে নগদ নিবন্ধিত। সম্প্রতি দুদক সব মোবাইল লেনদেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে সবার লেনদেন ব্যবস্থায় নজরদারি করতে 'অ্যাকসেস' চেয়েছিল। নগদ তা অনুমোদন করেছে। অথচ অন্যরা এখনও রাজি হয়নি। তাহলে বলুন, নগদ কি অস্বচ্ছ লেনদেন করে?

সমকাল :নগদে লেনদেন কি নিরাপদ?

তানভীর এ মিশুক :প্রায় শতভাগ। গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তার স্বার্থে এ মুহূর্তের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে নগদ। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে। ন্যাশনাল আইডি, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে ঘরে বসেই নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ নেই। একটি এনআইডি দিয়ে একের বেশি নগদ অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা হলে আগের অ্যাকাউন্টটিও ব্লক হয়ে যাবে।

সমকাল :অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবা থাকতে কেন মানুষ নগদ ব্যবহার করবে?

তানভীর এ মিশুক :কারণ এটা সর্বাধুনিক, নিরাপদ, সহজ এবং একই সঙ্গে ব্যয়-সাশ্রয়ী। নগদ এমন ব্যবস্থা চালু করেছে যে কারও অ্যাকাউন্ট না থাকলেও তার মোবাইলেও টাকা পাঠানো যাবে। টাকা পাওয়ার পর অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি তা তুলতে পারবেন। এ সেবা অন্য কারও নেই। আমাদের আধুনিক এ ব্যবস্থা সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানি কপি (অনুসরণ) করেছে। তা ছাড়া কিছুদিন আগেও মোবাইলে টাকা পাঠাতে হাজারে ২০ টাকা গুনতে হতো। আমরা তা সাড়ে ৯ টাকায় নিয়ে এসেছি।

সমকাল :এক বছরেরও কম সময়ে নগদের অর্জনগুলো জানতে চাই?

তানভীর এ মিশুক :বড় অর্জন গ্রাহক আস্থা। মাত্র ১১ মাসে নগদের গ্রাহক এক কোটি ২২ লাখ ছাড়িয়েছে। দৈনিক ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। নগদ আসার পর প্রতিযোগিতা বেড়েছে, খরচ কমছে- এটা আমাদের অন্যতম অর্জন। আমরা নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও সেবার মান বাড়িয়েছি। এটা দেখে অন্যরা নগদকে অনুসরণ করছে।

সমকাল : একবারে ৫০ হাজার টাকা লেনদেন করা যায় নগদে। এ বিষয়ে জানতে চাই।

তানভীর এ মিশুক : আমরা লেনদেনে একটু বেশি স্বাধীনতা দিচ্ছি। আজকের দিনে ৫০ হাজার টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। তা ছাড়া বেআইনিভাবে কিছু করা হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে। দেখুন, আমরা ছোট ব্যবসায়ীকেও এ লেনদেন ব্যবস্থায় আনতে চাইছি। একবারে ১০ বা ১৫ হাজার টাকার লেনদেন ব্যবস্থা চালু রেখে যা সম্ভব নয়। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণকে সরকার বছরে বিপুল যে ভাতা প্রদান করছে, তার পুরোটা নগদের মাধ্যমে পরিশোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অনুশাসন দিয়েছেন। এ জন্য এই পরিমাণ অর্থ লেনদেনের সুযোগ রাখতে হয়েছে।

সমকাল :আপনাদের আগামীর পরিকল্পনা জানতে চাই।

তানভীর এ মিশুক :আমরা চাই, দেশের সব মানুষের কাছে মোবাইল মানি ট্রান্সফার সেবা পৌঁছে দিতে। এ জন্য মোবাইল ফোন অপারেটর রবির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এর ফলে অপারেটরটির পাঁচ কোটি গ্রাহক নগদের গ্রাহক হবেন। আগামী এপ্রিলের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে।

মন্তব্য করুন