দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসএমই উদ্যোগকে একই ছাতার নিচে এনে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বিপণনের মাধ্যমে উন্নয়নে জোর দিচ্ছে সরকার। এ খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন মিরাজ শামস



দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোগ। এগুলোকে একই ছাতার নিচে এনে সমানভাবে উন্নয়নে জোর দিচ্ছে সরকার। একেক অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে একটি ক্লাস্টারের (গুচ্ছ) আওতায় এনে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। বর্তমানে সারাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ১৭৭ ক্লাস্টার রয়েছে। নতুন করে গড়ে ওঠা অন্যান্য উদ্যোগ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও খুঁজে বের করবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ সংস্থা। বড় শিল্পের সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা বাড়াতে পদক্ষেপও নিয়েছে ফাউন্ডেশন।

এসব বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) সঙ্গে জড়িত সরকারের সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতার উপায় খোঁজা হচ্ছে, যাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়। এর কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন দেশে ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে সফল হয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ভারতে ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই বেশ উন্নয়ন করেছে। ইন্দোনেশিয়াও এক্ষেত্রে সফল হয়েছে। দেশটির ৭০ হাজার গ্রামের মধ্যে ১০ হাজার গ্রামভিত্তিক ক্লাস্টার উন্নয়ন করে ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদন করছে। ইতালিতে ক্লাস্টারভিত্তিক পাদুকা ও চামড়া পণ্য, নিটওয়্যার, ফার্নিচার, টাইলস, বাদ্যযন্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজার দখল করেছে লেসন্স ব্যান্ড। লাতিন আমেরিকাও ক্লাস্টার উন্নয়নের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এসব পর্যালোচনা করে দেশে ক্লাস্টারভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে জোর দিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের সব এলাকার এসএমই উদ্যোগের পর্যালোচনা করা হবে। সেখান থেকে নতুন ক্লাস্টার চিহ্নিত করে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার সংযোগ স্থাপন এবং ক্লাস্টার উন্নয়নে পরামর্শ সেবা দেওয়া হবে। বিদ্যমান ক্লাস্টারগুলোতে প্রশিক্ষণ, পণ্য বিপণন ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা দেওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন। এ ধারা বজায় রাখতে নতুন ক্লাস্টারগুলোতেও ক্ষুদ্র শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে শিল্পে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে।

৫১ জেলায় এখন পর্যন্ত চিহ্নিত ১৭৭ ক্লাস্টারের মধ্যে অগ্রাধিকার খাতে ১২৯টি এবং অন্যান্য খাতে ৪৮ ক্লাস্টার রয়েছে। বাকি জেলাগুলোতে ক্লাস্টার চিহ্নিত করতে কাজ হচ্ছে। এগুলোসহ আগের জেলাগুলোয় নতুন করে আরও ক্লাস্টার উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশন গবেষণা করবে। বিদ্যমান ক্লাস্টারগুলোতে ২০১৩ সাল থেকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নসহ নানা সুবিধা দেওয়ায় অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন। এগুলোতে প্রায় ৭০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা চিহ্নিত হয়েছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আয় তাদের। এসব উদ্যোগে প্রায় ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি নারী। বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্যের ৩৪টি, হালকা প্রকৌশলের ৩১টি, নিটওয়্যার ও তৈরি পোশাকে ২২টি, নকশা ও কারুকাজে ১৬টি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ১৩টি, স্বাস্থ্য সেবা খাতে ৫টি, প্লাস্টিক খাতে ৩টি, ইলেকটিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স খাতে ৩টি ও শিক্ষা সেবা খাতে ২টি ক্লাস্টার রয়েছে। এর বাইরে অগ্রাধিকার খাত সফটওয়্যার, ওষুধ ও প্রসাধনী খাতের ক্লাস্টার চিহ্নিত হয়নি। তবে হস্তচালিত তাঁতের ৩৮টি ও কুটির শিল্পের ১০টি ক্লাস্টার রয়েছে।

জানতে চাইলে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ড. মাসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, ফাউন্ডেশন থেকে এই খাতের পরামর্শ, নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নসহ নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা রয়েছেন। যেমন যশোর ও বগুড়ার হালকা প্রকৌশল শিল্প, নাটোর ও ভৈরবের পাদুকা, বগুড়ার শাওইলের ঝুটকাপরের সুতা থেকে তাঁত ও সৈয়দপুরে ঝুট গার্মেন্টসসহ নানা পণ্যের এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা রয়েছে। তাদের এগিয়ে নিতে ক্লাস্টার চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি খাতে ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়নের কারণে অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দাঁড়িয়ে গেছেন। এর আলোকে নতুন স্থানে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ৪০ জেলায় কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। আগামীতে বাকি ২৪ জেলায় কাজ শুরু হবে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। এতে মূল ধারার ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়। এ জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে আরও একটি ক্লাস্টার গবেষণা শুরু করবে এসএমই ফাউন্ডেশন। তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন সংস্থা এসএমই উন্নয়নে কাজ করছে। এসব সংস্থার সঙ্গে এসএমইদের যোগসূত্র স্থাপন করার চেষ্টা করা হবে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক রাশেদুল করিম মুন্না সমকালকে বলেন, প্রতিটি জেলার বিশেষায়িত শিল্প গোষ্ঠী চিহ্নিত করে সুবিধা নিশ্চিত করতে ক্লাস্টার উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে এসএমই উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রতিটি জেলায় কমন ট্রেড ফ্যাসিলিটি সেন্টার করা প্রয়োজন। এটি হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি সবার জন্য সুবিধা দিতে ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন হবে। তিনি বলেন, পোশাক খাতের বিকল্প খাত দাঁড় করাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় ভিত্তি হতে পারে বিভিন্ন পণ্যের ক্লাস্টারগুলো। এ জন্য জেলা, থানা ও গ্রাম পর্যায়ে ক্লাস্টারের সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে এসএমই নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নার্সিং করা হলে একসঙ্গে অনেক সফল উদ্যোক্তা দেশে তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এসএমইর উন্নয়নে বিসিকের মহাপরিকল্পনা : পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই খাতে ও আলাদা খাতে ক্ষুদ্র উদ্রোক্তা ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক জায়াগায় পরিকল্পিত শিল্পনায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। মহাপরিকল্পনা অনুয়ায়ী, স্বল্পমেয়াদে ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার একর জমিতে বিসিক আরও ১০টি শিল্পপার্ক স্থাপন করবে। মধ্যমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিসিক ২০ হাজার একর জমিতে ৫০টি শিল্পপার্ক স্থাপন করে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ হাজার একর জমিতে ১০০ পরিবেশবান্ধব শিল্প পার্ক স্থাপন করবে। বর্তমানে দুই হাজার একর জমিতে বিসিকের স্থাপন করা ৭৬ শিল্পনগরী রয়েছে। এগুলো থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয় ১২ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ আয় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করতে চায় সংস্থাটি।

মন্তব্য করুন