সমকাল :শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ও ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কারণ কী বলে মনে করেন?

শহীদুল ইসলাম :ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার উদ্দেশ্যগত ও পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদের সুষম বণ্টন। ফলে সামগ্রিকভাবে বড় শিল্প বা ব্যবসার পাশাপাশি, এসএমই খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজে বিনিয়োগ সুবিধা পাচ্ছেন। ইসলামী ব্যাংকে লাভ-লোকসান অংশীদার ভিত্তিতে আমানত হিসেবে পরিচালিত হয়। ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রম শরিয়াহসম্মত নীতি অনুসরণ করে থাকে। তাই দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইসলামী মূল্যবোধের কারণে আমাদের গ্রাহক হচ্ছেন। পাশাপাশি, তুলনামূলক আন্তরিক ও দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। এসব কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সমকাল :ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আলাদা আইন না থাকার প্রভাব কতটা পড়ছে।

শহীদুল ইসলাম :দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৯ সালে একটি ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা করে। এখন এ ব্যবস্থার পূর্ণ বিকাশের জন্য পৃথক আইন প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ইসলামী ব্যাংকিং আইনের বিকল্প হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর নয়। ইসলামী ব্যাংকিং আইন হলে প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহ পরিপালন করে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। দেশে শরিয়াহ্‌ বিষয়গুলো দেখার জন্য সব ইসলামী ব্যাংকে আলাদা শরিয়াহ কমিটি আছে। এছাড়া সব ইসলামী ব্যাংকের জন্য সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা কোনো ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগ নেই।

সমকাল :করোনা পরিস্থিতি আপনার ব্যাংকে কী প্রভাব ফেলেছে?

শহীদুল ইসলাম :করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর বিরূপ প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতেও পড়েছে। বিশেষ করে রপ্তানি খাত একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতও এর বাইরে নয়। অবশ্য ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং কর্মসংস্থানে যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে সেজন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রণোদনা যাতে উপযুক্ত গ্রাহকরা পান এবং এর অপব্যবহার না হয় সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখছে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক। গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জেনে বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকগুলো অ্যাসেট লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট ও খেলাপি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় সমস্যায় পড়বে।

সমকাল :পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আপনাদের পরিকল্পনা বলুন।

শহীদুল ইসলাম :আমাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিপূর্ণ ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে। আমরা ডিজিটাল অন-বোর্ডিংয়ের কাজ শুরু করেছি। এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক খুব সহজে নিজের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। দ্রুত সেবা নিশ্চিতের জন্য মিসড কল অ্যালার্ট ও গ্রাহকদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগের জন্য ফেসবুক পেজ চালু করা হয়েছে। এভাবে ব্যাংকিং সেবা আরও যুগোপযোগী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সমকাল :পরিবেশবান্ধব খাতে শাহ্‌জালাল ব্যাংক কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

শহীদুল ইসলাম :শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের প্রতি নিষ্ঠার প্রমাণ বহন করে প্রধান কার্যালয়ের ভবনটি, যা 'লিড সার্টিফিকেট' পেয়েছে। করপোরেট জগতেও এ ভবন বহুল প্রশংসিত। ব্যাংকের নিজস্ব টেকসই অর্থায়ন ইউনিটের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন ও পরিবেশবান্ধব ইন হাউস ব্যাংকিং নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া পেপারলেস ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও ২০২০ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা, কল সেন্টার ও ইকেওয়াইসি সেবা চালু করা হয়েছে। পরিবর্তিত অবস্থায় সব সেবায় ফিনটেক প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সমকাল :ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা কী?

শহীদুল ইসলাম :ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বর্তমানে কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর অন্যতম হলো- গ্রাহক পর্যায়ে মুদারাবা আমানতকারী ও বিনিয়োগ গ্রহীতা উভয়েরই ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালার মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণার অভাব। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন নীতি প্রণয়নের সময় ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর শরিয়াহভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় নেয় না। যেমন ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব ব্যাংকের জন্য একই নীতি কাঠামো প্রণয়ন করে। অথচ ইসলামী ব্যাংকগুলোর হাই কোয়ালিটি লিকুইড অ্যাসেট অপরাপর প্রচলিত ব্যাংকগুলোর চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম থাকে। কেননা ইসলামী ব্যাংকগুলো সরকারি সুদভিত্তিক বিভিন্ন ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে না। যদিও সম্প্রতি সরকার প্রথমবারের মতো সুকুক বন্ড চালু করেছে। এতে ইসলামী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে। অন্যদিকে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী আর্থিক লেনদেনে ইসলামিক নীতিমালা অনুসরণে আগ্রহী হওয়ার ফলে এ খাতে সম্ভাবনা অসীম। এর পরিপূর্ণ বিকাশে সর্বপ্রথম একটি পৃথক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং আইন করতে হবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি

মন্তব্য করুন