২০১৫ সালে গড়ে প্রতিদিন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বা এমএফএসে ৩৩ লাখ বার লেনদেন হতো। ২০২০ সালে এসে লেনদেন হয়েছে গড়ে প্রতিদিন ৯০ লাখের বেশি, টাকার অঙ্কে গড়ে প্রতিদিন ১৬০০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ, প্রতিদিন কোটি গ্রাহক জীবন সহজ করা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নানা সেবা ব্যবহার করছেন। দিন দিন এর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলছে। তবে এর পরও অজ্ঞতা, ভয় ও লোভে পড়ে বহুল জনপ্রিয় এ মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হন কিছু গ্রাহক। অথচ একটু সচেতন হলেই তারা নিরাপদে নিশ্চিতে ব্যবহার করতে পারেন এ সেবা।

সচেতনতার জন্য কিছু উদাহরণ এখানে দেওয়া হলো। ধরা যাক, আবিদা সুলতানা অফিসের জরুরি কাজে ব্যস্ত। এর মাঝেই কাস্টমার কেয়ারের মতো একটা নম্বর থেকে ফোন। বলা হলো, আপনার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের তথ্য আপডেট করতে হবে, না হলে বন্ধ হয়ে যাবে। ভীষণ প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি অপরিচিত এই নম্বরেই তার ওটিপি, পিন সব জানিয়ে দিলেন এবং কিছুক্ষণ পর আবিস্কার করলেন অ্যাকাউন্টে টাকা নেই।

প্রতারণার আরও কৌশল আছে। যেমন- বশির আহমেদ কোনো দোকান থেকে ২০০০ টাকা ক্যাশ আউট করিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরেই ফোন, আপনি ক্যাশ আউট করিয়েছেন, আপনার অ্যাকাউন্টে সমস্যা আছে। তিনি বিশ্বাস করেই কথা বলতে বলতে সব গোপন তথ্য শেয়ার করে দিলেন এবং প্রতারণার শিকার হলেন। মনে করুন, অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবরিনাকে বলা হলো, আপনি ৭০ হাজার টাকা লটারি জিতেছেন। ১০ হাজার টাকা পাঠান বা কিছু তথ্য দিন। তিনি খুশিতে পিন ও ওটিপি জানিয়ে প্রতারণার শিকার হলেন।

সব প্রতারণার ক্ষেত্রে সামাজিক এসব অপকৌশল ব্যবহূত হয়। গ্রাহকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার গোপন তথ্য সংগ্রহ করেই অসাধু প্রতারক চক্র প্রতারণা করার সুযোগ পায়। অথচ একটু সচেতন হলেই গ্রাহক তার অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে পারতেন। সচেতনতার কারণেই অনেক গ্রাহক এমন ফোন পেয়ে কোনো তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকেন এবং অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখেন। এক মনোসামাজিক গবেষণায় দেখা যায়, গোপন তথ্য নিয়ে অসচেতনতা, প্রতারকের কথায় বিশ্বাস করা, অযথা ফোনে অপরিচিত নম্বরে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা- এমন অনেক ভুল পদক্ষেপ নিয়েই ফাঁদে পড়েন এমএফএস ব্যবহারকারীরা।

প্রতারকদের প্রথম কৌশল থাকে গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করা। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কল সেন্টারের মতো প্রায় একই রকম দেখতে নম্বর থেকে ফোন করা, এজেন্ট পয়েন্ট থেকে কৌশলে ক্যাশ আউট বা সেন্ড মানির তথ্য জোগাড় করে গ্রাহককে বলা। যেমন আপনি তো এত টাকা ক্যাশ আউট করেছেন- এমন কথা বলে গ্রাহকের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে তারা। মোবাইল আর্থিক সেবা মানুষের অসংখ্য আর্থিক লেনদেন সহজ করে দেওয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকদের এক ধরনের ভালো লাগা থাকে। ফলে অপরিচিত নম্বরেও যখন ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বলছি বলা হয়, তখন সন্দেহ না করে কথা বলা শুরু করেন। যিনি জানেন প্রতারণা হয়, তিনিও বিশ্বাস করেন অনেক সময়।

মনোসামাজিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পিন নম্বর বা ওটিপি যে গ্রাহকের গোপন তথ্য, সে বিষয়ে বেশিরভাগ গ্রাহকই সচেতন নন। ফলে তথ্য খুব সহজেই জানিয়ে দেন প্রতারকদের। ছয় সংখ্যার নম্বরটি বলুন, একটি সংখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে পিন নম্বর যোগ করে বলুন, পিনের প্রথম সংখ্যার সঙ্গে এক বা দুই যোগ করে পরের সংখ্যা বলুন- এমন অনেক প্রশ্নের উত্তরে মোবাইল অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য শেয়ার করে বিপদে পড়েন গ্রাহক। যারা প্রতারণার ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘক্ষণ অপরিচিত নম্বরে কথা বলেন, অনেক সময় নিজেই নিজের অন্য একটি মোবাইল নম্বর দিয়েও প্রতারকের সঙ্গে কথা চালিয়ে যান। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য আসা ওটিপি এবং পিন উভয় তথ্য জানিয়ে দেন। ফলে প্রতারণার শিকার হন।

মন্তব্য করুন