দুই দশকের পুরোনো ব্যাংকও প্রচলিত ব্যাংকিং ছেড়ে ইসলামী ব্যাংকিং শুরু করেছে। চাহিদা তৈরি হওয়ায় ৬২ ব্যাংকের ১১টি পূর্ণাঙ্গভাবে এবং ৩৪টি বিভিন্নভাবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এবারের সমৃদ্ধির আয়োজন প্রতিনিয়ত পরিধি বাড়তে থাকা ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে। মূল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন শেখ আবদুল্লাহ

বাজার প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জে টিকে থাকতে প্রচলিত ধারার অনেক ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে যাচ্ছে। কিছু ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং শুরু করেছে। কেউ কেউ আলাদা শাখা ও উইন্ডো খুলে ইসলামী ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। আবার কেউবা ইসলামী ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু করছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমানতকারী ও গ্রাহকদের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোও বড় পরিসরে শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রমে ঝুঁকছে।

২৭ বছরের পুরোনো যমুনা ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং শুরু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে। এখন কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কার্যক্রম শুরুর ২০ বছর পর নিজেদের পাল্টে চলতি বছরের শুরু থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। একই দিনে ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক নতুন নামে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং শুরু করেছে। ব্যাংকটির নতুন নাম গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এদিকে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সব শাখায় চালু করবে ইসলামী ব্যাংকিং। এ ছাড়া মার্কেন্টাইল, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকসহ প্রচলিত ধারার কয়েকটি ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে বের হয়ে আসতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে।

ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য রয়েছে। এ তথ্য অনুযায়ী দেশে আট ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম করছে। এসব ব্যাংকের শাখার সংখ্যা এক হাজার ৪৬৪টি। এর সঙ্গে এখন স্ট্যান্ডার্ড, গ্লোবাল ইসলামী ও যমুনা ব্যাংকের শাখা যোগ হবে। অন্যদিকে ৯ প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১৯ ইসলামী ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। এ ছাড়া ১২ বাণিজ্যিক ব্যাংকের রয়েছে ১৬৬ ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সংখ্যায় কম হলেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাতের আমানত ও বিনিয়োগের এক-চতুর্থাংশের বেশি ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে ৬২ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ঝোঁকা প্রসঙ্গে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, কোন ব্যাংক কী বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যাচ্ছে, সেটা তারাই ভালো জানে। তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড কম। স্বেচ্ছায় অনেক আমানত আসে। আমানতকারীরা দর কষাকষি করেন না। তাদের বেশিরভাগই একটি ব্যাংকে আমানত রেখেই খুশি থাকেন। অন্যদিকে ঋণ বিতরণে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে পার্থক্য কিছু নেই। ফলে রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট ভালো। আবার রেমিট্যান্স সংগ্রহ হয় বেশি। এসব কারণে ইসালামী ব্যাংকিংয়ে ঝোঁক বাড়ছে।

ব্যাংকগুলোতে গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ছিল ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছিল তিন লাখ ১৯ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। একইভাবে পুরো ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে আটটি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগের পরিমাণ দুই লাখ ৮৪ হাজার ১০ কোটি টাকা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স সংগ্রহেও এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের ৩১ দশমিক ৫৩ শতাংশ আসছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। অন্যদিকে দেশজুড়ে বিস্তৃত ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের আট ভাগের এক ভাগ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে। গত সেপ্টেম্বর শেষে মোট শাখা ছিল ১০ হাজার ৬০৭টি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এক হাজার ৪৪৮টি। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ৩৬ হাজার ৩৩৭ কর্মী কাজ করছেন। সদ্য ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যোগ হওয়া স্ট্যান্ডার্ড, গ্লোবাল ইসলামী ও যমুনা ব্যাংকের আমানত, ঋণ, রেমিট্যান্স ও জনবল এ হিসাবে যুক্ত হয়নি।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, প্রকৃত বা পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম দেশে এখনও সেভাবে হচ্ছে না। প্রচলিত ধারার ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর কাজের মধ্যে শব্দগত পার্থক্য ছাড়া পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াগত পাথর্ক্য বিশেষ নেই। এ জন্য ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা দরকার, যা এখনও হয়নি। এ নীতিমালা না করে ইসলামী ব্যাংকিং করার অনুমোদন দেওয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৮৩ সালে। ওই বছর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। এরপর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার হয়েছে। নতুন পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক যেমন এসেছে, তেমনি প্রচলিত ধারার অনেক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডো চালু করেছে। জনসাধারণের আমানত সংগ্রহ, শিল্প, ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ, প্রবাসী আয় সংগ্রহে জনপ্রিয় হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। গত ৩৮ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকিং।

জনগণের সিংহভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহজে প্রসার পেয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে প্রচুর আমানত এসেছে এই ধারার ব্যাংকগুলোতে। ব্যাংকারদের মতে, এক্ষেত্রে এখনও অবশ্য অনেক দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা না থাকা অন্যতম। দেশে ইসলামী ব্যাংকিং যতটা এগিয়েছে, তাতে স্বতন্ত্র নীতিমালা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এ নীতিমালা করা হলে ইসলামী ব্যাংকিং আরও প্রসারিত হবে। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থার মন্দ ঋণ কমে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থায়ন সহজ হবে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পথ ধরে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আল বারাকা ব্যাংক বাংলাদেশ। পরে যেটি 'ওরিয়েন্টাল ব্যাংক' এবং বর্তমানে 'আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক' নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর পর ১৯৯৫ সালে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে দেশে 'ফয়সাল ইসলামিক ব্যাংক' প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এর নাম হয় 'শামিল ব্যাংক অব বাহরাইন' (ইসলামি ব্যাংকার্স)। বর্তমানে দেশে এ ব্যাংকের কার্যক্রম নেই। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক। দেশে প্রথম প্রচলিত ব্যাংকিং ছেড়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আসে এক্সিম ব্যাংক; সময়টা ২০০৪ সালের ১ জুলাই। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং পরিহার করে ইসলামী পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক নাম ধারণ করে। পরে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কারণে গত সাড়ে তিন দশকে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বহুজাতিক এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডও ইসলামী ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এইচএসবিসির রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং শাখা। অন্যদিকে স্টান্ডার্ন্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো। বাংলাদেশের মতো অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতেও ব্যাংকটি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। এ ছাড়া দি সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ব্যাংক আলফালাহর রয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং শাখা। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো কার্যক্রম পরিচালনা করছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, পূবালী, ট্রাস্ট, স্ট্যান্ডার্ড ও ব্যাংক এশিয়া। অন্যদিকে মার্কেন্টাইল, মিডল্যান্ড ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের আমানত রাখার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে মুদারাবা আমানত সবচেয়ে বেশি। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত সংগ্রহে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির হাতে রয়েছে মোট আমানতের ৩৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর পর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের কাছে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, আল আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের কাছে ১০ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কাছে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের কাছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের কাছে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ আমানত রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং শাখাগুলোতে মোট আমানতের ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোগুলোতে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ আমানত রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাই মুরাবাহ সবচেয়ে প্রচলিত। মোট বিনিয়োগের প্রায় ৪৫ শতাংশ করা হয়েছে এ পদ্ধতিতে। এর পর রয়েছে বাই মুয়াজ্জল। এ ব্যবস্থায় মোট বিনিয়োগের ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ করা হয়েছে। বাকি বিনিয়োগ করা হয়েছে বাই সালাম, ইজারা অ্যান্ড ইজারা, বাই ইসতিসনা, মুসারাকাসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে। এ ধারার ব্যাংকগুলো আধুনিক ধারার সব ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য সুকুক বন্ড চালু করেছে। সুদবাহী বিনিয়োগ বন্ডে ইসলামী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে না বলে নতুন ধরনের এ বন্ড চালু করা হয়েছে। তারল্য ব্যবস্থাপনার নতুন এ মাধ্যমে সরকার চাইলে ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকেও মূলধন নিতে পারবে। এই ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ ব্যবসা ও বাণিজ্যে। এর পরই শিল্প খাতের চলতি মূলধনে বিনিয়োগ রয়েছে তাদের। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত, আবাসন, পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ, কৃষি খাতে বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাংকগুলোর।

মন্তব্য করুন