সমকাল :করোনার মধ্যেও আবাসন খাতে সুদিন ফিরছে বলে শোনা যাচ্ছে। আপনার কাছে বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাই।

তানভীরুল হক :করোনার প্রথম দিকে অন্য সব খাতের মতো আবাসন খাতের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখন অবস্থা বেশ ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে করোনাকালে সরকার বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ মিলছে। প্রবাসীরাও নিরাপদ বাসস্থানের জন্য দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। আবার যারা সেকেন্ড হোম করার জন্য বিদেশে টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন, তারাও করোনার কারণে দেশে বিনিয়োগ করছেন। এ কারণে আবাসন খাতে এখন বিনিয়োগ বাড়ছে। তা ছাড়া অনেকদিন ধরে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি খারাপ যাওয়ায় মানুষ আবাসনে বিনিয়োগ করছে। এর বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। রাজধানীর বাইরের প্রকল্পেও ধীরে ধীরে সাড়া বাড়ছে। এখন সরকারের পরিকল্পনায় বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত।

সমকাল :করোনা-পূর্ববর্তী আগের অবস্থায় বেচাকেনা ফিরেছে কি?

তানভীরুল হক :করোনার প্রভাব কাটিয়ে জুন থেকে আবার নতুন প্রকল্প নেওয়া শুরু করেছে কোম্পানিগুলো। ব্যবসা পরিস্থিতি অনেকটা ঘুরে দাঁয়িড়েছে। এখন ফ্ল্যাট বেচাকেনা প্রায় আগের মতোই হচ্ছে।

সমকাল :করোনার ধাক্কা কাটাতে কেমন সময় লাগবে?

তানভীরুল হক :আবাসন খাতে এখন যেভাবে গতি এসেছে, তা বজায় থাকলে অনেকটা দ্রুত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে মন্দার প্রভাব ও করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এখন ব্যবসা ভালো হলেও ঋণের চাপ কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তবে রডের দাম বৃদ্ধি নতুন করে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কারণ, এতে আগে থেকে বিক্রি করা প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাবে।

সমকাল :আর কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?

তানভীরুল হক :আবাসন খাতের উন্নতির জন্য আরও কয়েক বছর সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সুবিধা দিতে হবে। রাজউক থেকে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন নিয়মে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের সময় রাজউকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে যেতে হয়। এ নিয়ম পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অন্যান্য সরকারি সংস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও নিরসন করতে হবে। নির্মাণ উপকরণের দামের অস্থিরতা দূর করা দরকার। প্রকল্প এলাকায় যেসব সেবা সরকারি সংস্থার দেওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে দেওয়া উচিত। এটি নিশ্চিত হলে আবাসন নির্মাণে ব্যয় অনেক কমে আসবে। এ ছাড়া নিবন্ধন ব্যয় কিছুটা কমেছে। এটা আরও কমানো প্রয়োজন।

সমকাল :আবাসন খাতে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ সম্ভাবনা কেমন?

তানভীরুল হক :দেশের আবাসন খাতে দেশি-বিদেশি সবার বিনিয়োগের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ এলে ভালো। তবে এফডিআই টানতে বিদেশি কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশি কোম্পানি যে দামে জমি কিনতে পারছে, বিদেশি কোম্পানিকে একই দাম দিতে হবে। অনেক দেশের মতো দেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। এতে দেশে প্রযুক্তি স্থানান্তর সহজ হবে। দেশি কোম্পানির সক্ষমতা বাড়বে।

সমকাল :অনলাইনে ফ্ল্যাট বেচাকেনায় সাড়া মিলছে কেমন?

তানভীরুল হক :ফ্ল্যাট ও প্লটের বেচাকেনা এখনও পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক হওয়া সম্ভব নয়। ক্রেতারা সরাসরি ফ্ল্যাট বা প্লট দেখতে আগ্রহী। তা ছাড়া নিবন্ধন করতে সরাসরি যেতে হয়। তবে প্রাথমিক তথ্য জানার ক্ষেত্রে প্রাথমিক আলোচনার জন্য খুবই ভালো মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন।

সমকাল :বর্তমানে ফ্ল্যাটের দাম ও মান সম্পর্কে জানতে চাই।

তানভীরুল হক :ফ্ল্যাটের দাম তেমন বাড়েনি। শ্রম ও নির্মাণ ব্যয় বাড়লেও দাম বাড়ানো হয়নি। তাই ফ্ল্যাট কেনার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে বিশেষ এলাকার ফ্ল্যাটের দাম সব সময় বেশি। গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ কিছু এলাকার ফ্ল্যাটের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বর্গফুট। মিরপুরসহ কিছু এলাকায় দাম পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। ভালো কোম্পানিগুলো দাম কিছুটা বেশি নিলেও মানসম্মত ফ্ল্যাট দিচ্ছে। যেমন ঢালাইয়ের কাজে পাথর ব্যবহার করছে। যেসব কোম্পানি চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা বর্গফুটে ফ্ল্যাট বিক্রি করছে, তারা ইটের ঢালাই করে ভবন তৈরি করছে।

সমকাল :দেশে ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি মার্কেটের কতটা সম্ভাবনা রয়েছে?

তানভীরুল হক :এখন সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় সেকেন্ডারি মার্কেট। এ মার্কেটে অনেক কোম্পানি নতুন করে যুক্ত হয়েছে। বাজারটি বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছে। এখন সেকেন্ডারি ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় নতুন ফ্ল্যাটের সমান। এটি কমিয়ে নামমাত্র করা হলে এ বাজার বেশ প্রসার পাবে।

সমকাল :আপনার কোম্পানি বিল্ডিং ফর ফিউচারের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

তানভীরুল হক :বিল্ডিং ফর ফিউচার একসঙ্গে অনেক বেশি প্রকল্প কখনোই নেয়নি। নিয়মিত ৮ থেকে ১০ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এ কারণে ফ্ল্যাটের মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের আস্থাও ধরে রেখেছে। আবাসনের পাশাপাশি ফার্নিচার, গ্লাস ও কেমিক্যাল খাতের ব্যবসায় কোম্পানি যুক্ত হয়েছে। হাউজিং অ্যান্ড টেকনোলজির মাধ্যমে রাজধানীর বড় বড় স্থাপনায় গ্লাস স্থাপনের কাজ করছে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরাজ শামস

মন্তব্য করুন