বিশ্ববাজারে চাহিদার কারণে কৃত্রিম তন্তুতে বিনিয়োগ করছেন উদ্যোক্তারা। দেশে ৪০ কারখানা এখন পর্যন্ত এমন তন্তু উৎপাদন করছে। বস্ত্র খাতে তুলার বিকল্প নতুন এ প্রবণতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আবু হেনা মুহিব

বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যানমেইড ফাইবার পোশাকের কদর এবং চাহিদা এখন নিরঙ্কুশ। অভিজাত, টেকসই, কেতাদুরস্ত সব ধরনের পোশাক হচ্ছে কৃত্রিম তন্তুর বস্ত্রে। এ কারণে ভোক্তা, ক্রেতা ও ব্র্যান্ড সবার ঝোঁক এখন কৃত্রিম তন্তুতে। এতে ক্রমে ম্লান ও মলিন হয়ে আসছে তুলার মতো প্রাকৃতিক তন্তুর বস্ত্র ও পোশাকের বাজার। বৈশ্বিক এ প্রবাহের প্রায় বিপরীতে চলছে দেশের এ দুই খাত। এখনও তুলানির্ভর এ দেশের বস্ত্র ও পোশাক। এ তুলাও বলতে গেলে প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। এ নির্ভরতা দেশের পোশাকশিল্পকে খুব বেশি এগোতে দেয়নি। শুল্ক্কমুক্ত বাজার সুবিধা কিংবা সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য শ্রমের সুবিধা কোনো কিছুতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম তন্তুর আধিপত্য। প্রায় এক দশক ধরে চলছে এ প্রবণতা। বাংলাদেশও অবশ্য প্রবেশ করতে শুরু করেছে কৃত্রিম তন্তুতে তৈরি পোশাকপণ্যে। কৃত্রিম তন্তুর বিশ্ববাজার এখন ১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ। যেখানে তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ ৬ শতাংশ। এ দুর্বলতাই এখন বড় মাথাব্যথা বলে মনে করছেন খাত-সংশ্নিষ্টরা।

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় এ রকম কয়েকটি কৃত্রিম তন্তুর পোশাকপণ্যের মধ্যে রয়েছে গাউন, ওভারকোট, টাই, সুট-কোট, জার্সি, ট্রাউজার, পুলওভার, শার্ট ইত্যাদি। কৃত্রিম তন্তুতে বানানো পোশাক টেকসই, উজ্জ্বল এবং বারবার ধোয়ার পরও রং নষ্ট হয় না। বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট পোশাক রপ্তানির ১১ শতাংশের মতো কৃত্রিম তন্তুর পোশাক। বছরে কম বেশি ৩০০ কোটি ডলারের কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে।

বিশ্ববাজারে চাহিদার কারণে কৃত্রিম তন্তুতে নতুন বিনিয়োগ করছেন উদ্যোক্তারা। বিটিএমএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪০ কারখানা এখন পর্যন্ত কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডিবিএল গ্রুপ, প্যাসিফিক জিন্স, মালেক স্পিনিং ইত্যাদি।

কৃত্রিম তন্তু আসলে কী :সরাসরি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদিত ফাইবারে প্রস্তুত সুতাকে কৃত্রিম তন্তু বলা হয়ে থাকে। এতে প্রস্তুত বস্ত্র ও তৈরি পোশাকসহ উৎপাদিত সব পণ্যকে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যানমেইড (এমএমএফ) পণ্য বলা হয়। কৃত্রিম তন্তু আবার দুই ধরনের। পলিয়েস্টার স্টেপল ও বিসকস স্টেপল। ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক তন্তুর মিশ্রণ থেকে উৎপাদিত সুতা হচ্ছে বিসকস স্টেপল। কাঠ ও বাঁশের তৈরি মূল ফাইবারের সঙ্গে অন্যান্য কাঁচামালের মিশ্রণে এ জাতীয় সুতা উৎপাদিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে পলিয়েস্টার স্টেপল ও পেট্রোলিয়াম ফাইবার থেকে উৎপাদিত সুতা হচ্ছে পলিয়েস্টার স্টেপল। ক্রুড অয়েল ও পরিত্যক্ত প্লাস্টিক হচ্ছে এ জাতীয় সুতার প্রধান কাঁচামাল। শিপন, জর্জেট, পলিমার ইত্যাদি উৎপাদনে এ সুতা ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন পশুর পশম থেকেও ম্যানমেইড ফাইবার সুতা উৎপাদন করা হয়। পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতলসহ নতুন অনেক বৈচিত্র্যের ম্যানমেইড ফাইবার সুতা আসছে এখন বস্ত্র খাতে।

ধীরে বাড়ছে কৃত্রিম তন্তুতে তৈরি বস্ত্র :বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় তিনশ কোটি কেজি সুতা উৎপাদিত হয় দেশে। এরমধ্যে কৃত্রিম তন্তুর অংশ ২০ শতাংশের মতো। ২০২০ পঞ্জিকা বছরে উৎপাদিত সুতার পরিমাণ ছিল ৩২৭ কোটি কেজি। এর মধ্যে কৃত্রিম তন্তুর পরিমাণ মাত্র ৭২ হাজার ৫০৪ টন। গত তিন বছরের ডাটা থেকে দেখা যায়, ২০১৯ সালে উৎপাদিত সুতার পরিমাণ ছিল ২৯৭ কোটি কেজি। ওই সময়ে কৃত্রিম তন্তুর পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ২৮৯ টন। এর আগের বছর ২০১৮ সালে উৎপাদিত সুতার পরিমাণ ছিল ২৯৫ কোটি কেজি। ওই বছর কৃত্রিম তন্তুর পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ২৭৮ টন।

কটন ফেব্রিক্সের রপ্তানি কমছে :বস্ত্র খাত বলতে সুতা ও কাপড় বা ফেব্রিক্স উৎপাদন এবং বাণিজ্যকে বোঝানো হয়। তথ্য বলছে, কৃত্রিম তন্তুর চাহিদার কারণে তুলা দিয়ে তৈরি সনাতনি ফেব্রিক্সের চাহিদা কমছে। ফেব্রিক্স সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ পঞ্জিকা বছরে ২৭৯ কোটি ডলারের ফেব্রিক্স রপ্তানি হয়েছে। ডলারপ্রতি ৮৬ টাকা বিনিময় হারের হিসেবে রপ্তানির এ অর্থমূল্য দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি দু'ধরনের রপ্তানি আছে। প্রচ্ছন্ন রপ্তানি হচ্ছে, রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বা রপ্তানি। অন্যদিকে সরাসরি রপ্তানি তো জানা কথা, বিদেশে বিক্রি। সরাসরি রপ্তানি খুব কমই হয়ে থাকে। ২০১৯ পঞ্জিকা বছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল আরও বেশি ৩০৬ কোটি ডলার। ২০১৮ সালে ছিল ৩২৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত তিন বছরে কাপড় বা ফেব্রিক্স রপ্তানি কমেছে। একই কারণে চাহিদা কমে তুলার আমদানিও কমছে। গত তিন বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে আমদানি করা তুলার পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৯৮ হাজার টন। ২০১৯ সালে আমদানির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ টন কমেছে। আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টন। সমাপ্ত ২০২০ সালে অবশ্য আবার কিছুটা বেড়েছে। তুলা আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৫৭ হাজার টন তুলা।

করোনা বাড়িয়েছে চাহিদা :করোনার কারণে সারা বিশ্ব নাস্তানাবুদ। দেশের অন্যান্য শিল্প খাতও বেকায়দায়। তবে এর মধ্যে বস্ত্র খাতে বড় ধরনের উল্লম্ম্ফন দেখা গেল। মহামারি করোনা একমাত্র বস্ত্র খাতের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজে লেগেছে। উৎপাদন বেড়েছে ২০ শতাংশ। পুরোনো সুতা কাপড়ও বিক্রি শেষ। কোনো কারখানায় মজুদ নেই। এত দিন দেশি বস্ত্র ব্যবহার করত না এরকম অনেক পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও এ সময় দেশি বস্ত্র ব্যবহার করতে এক রকম বাধ্য হয়েছে।

জানতে চাইলে ইশরাক টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক সমকালকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার আশাবাদ থেকে বিশ্ববাজারে আবার চাহিদা বেড়েছে। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো এ রকম অনুমান থেকে রপ্তানি আদেশ বাড়িয়েছে। আবার দেশেও দ্বিতীয় ধাক্কা এতটা ভয়াবহ না হওয়ায় ভোক্তা চাহিদা তৈরি হয়েছে। সামনে পহেলা বৈশাখ ও পরপর দুটি ঈদ। এ কারণে আশঙ্কার বিপরীতে হঠাৎ বাজার অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে। তিনি জানান, মূলত দুই ঈদ এবং পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয় স্থানীয় বস্ত্র খাত। করোনার কারণে গত বছর এ তিনটির কোনো আয়োজন কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সেই ক্ষতি এবার ভালোভাবেই পুষিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তিনি জানান, চোরাচালান এবং প্রতিযোগী দেশে সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে ভর্তুকি এবং রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়ার কারণে আমদানি করা সুতা ও বস্ত্রের মূল্য কম। অন্যদিকে মজুরি এবং সেবা ব্যয় বাড়ার কারণে দেশি সুতা ও বস্ত্রের দর তুলনামূলক বেশি। সঙ্গে ছিল চোরাচালানের অবাধ কারবার। এ কারণে দেশি সুতা ও বস্ত্র ব্যবসায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। বিটিএমএর তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি জানান, করোনার আগে ৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত ছিল। এখন অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টেছে। বড় চাহিদার সব বস্ত্র কলে এখন প্রচুর রপ্তানি আদেশ আসছে। প্রচুর কাজের চাপে ব্যস্ততা বেড়েছে মিলগুলোতে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পোশাক রপ্তানিকারক কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাকালে সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশি সুতা ও বস্ত্র ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন তারা। অ্যাডাম অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল হক মুকুল সমকালকে জানান, দেশের বস্ত্রকল থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ মিলছে। প্রয়োজনের সময় কাঁচামাল হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে। এতে সাশ্রয়ী দামের পাশাপাশি লিড টাইম কমের সুবিধা মিলছে। সারা বছর দেশি বস্ত্র ব্যবহারের অসুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেশিরভাগ সময় ক্রেতাদের নির্ধারিত উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। আবার সব মানের সুতা ও কাপড় দেশে পাওয়া যায় না। স্বাভাবিক অবস্থায় তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটাগরির পণ্যের সুতা ও বস্ত্রের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ জোগান দেওয়া হয় স্থানীয়ভাবে। ওভেন ক্যাটাগরিতে এ হার অনেক কম। ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ।

মন্তব্য করুন