উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন ঠিকমতো কেন হচ্ছে না তার একটা ক্ষুদ্র উত্তর আছে, আরেকটা দীর্ঘ। ক্ষুদ্র উত্তর হচ্ছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় নকশা থেকে শুরু করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং তারা কীভাবে কাজ করবে, কাজের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি- প্রতিটি জায়গাতেই আমরা থেমে যাই। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্যটাই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা।

যদি দীর্ঘ উত্তর দিতে যাই তাহলে অনেক কিছুই বলতে হবে। আমরা জানি, মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকেই উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা হয়। সূচনা স্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন স্তর আছে। নিয়ম হলো, মূল ডকুমেন্ট অর্থাৎ ডিপিপি সঠিকভাবে তৈরি হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দেখবে, সচিব দেখবেন, মন্ত্রী দেখবেন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্নিষ্ট বিভাগ দেখবে। প্রকল্পের কী কী কম্পোনেন্ট আছে, কত ব্যয়, ক্রয় কীভাবে হবে, কনসালট্যান্ট লাগলে কীভাবে নিয়োগ করা হবে, প্রশিক্ষণের দরকার হলে কীভাবে তা হবে ইত্যাদি বিস্তারিত সেখানে থাকার কথা। সেই সঙ্গে গুণগত মানের কর্মপরিকল্পনাও থাকার কথা। কিন্তু আমরা দেখি, যেনতেনভাবে প্রকল্প এডিপিতে ঢোকানোর প্রবণতা দেখা যায়। এডিপিতে একবার ঢুকাতে পারলেই প্রকল্প বরাদ্দ পাবে। এভাবে তাড়াহুড়া করে প্রকল্প পাস করার পরে যখন বাস্তবায়ন শুরু করা হয়, তখন দেখা যায় নকশাতেই সমস্যা আছে। ত্রুটিপূর্ণ কিংবা অসম্পূর্ণ নকশা এবং হিসাবপত্রে ভুল ও অসংগতি দেখা যায়। নকশায় সমস্যা থাকলে বাস্তবায়ন তো ঠিকভাবে করা যাবে না। এজন্য পরে আবার সংশোধন করতে হয়। একটি সাধারণ প্রকল্পেও এক-দেড় বছর সময় লেগে যায়।

ডিপিপি ঠিক থাকলেও সমস্যা দেখা যায়। একনেক থেকে পাস হওয়ার পরে প্রকল্পের পরিচালক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট, টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট ইত্যাদি নিয়োগেও অনেক সময় চলে যায়। এমনও হয়, প্রকল্প পরিচালক পাওয়া গেল তো অ্যাকাউন্ট্যান্ট পাওয়া গেল না, অ্যাকাউন্ট্যান্ট পাওয়া গেল তো টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট পাওয়া গেল না। যে কারণে একনেকে অনুমোদন হওয়ার পরও দরপত্র আহ্বান করা যায় না। এখানে আবার দেনদরবারও আছে। কিছু ক্ষেত্রে লোকজন আসতে চায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক লোকের আগ্রহ। দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু সময় নষ্ট হয়ে যায়। যেখানে খুব বেশি আগ্রহ, সেখানে সেখান আবার তদবির থাকে। যে কারণে নিয়োগ দেওয়ার পরও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। তাই প্রকল্পের জনবল নিয়োগে অনেক সময় লেগে যায়।

এরপর আছে ক্রয় প্রক্রিয়া। বড় আকারের ক্রয়ে নানা কারণে দেরি হয়। আর যদি নির্মাণভিত্তিক প্রকল্প হয়, সেখানে ভূমি অধিগ্রহণে নানা জটিলতা তৈরি হয়। একবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, একনেকে নেওয়ার আগে ভূমি অধিগ্রহণের সব সমস্যা সমাধান করতে হবে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আর করা যায়নি। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকল্প একনেকে পাস হয়ে গেছে, ভূমি অধিগ্রহণও হয়ে গেছে, কিন্তু আদালতে কেউ গিয়ে বলল তাকে ঠিক দাম দেওয়া হয়নি।

একটা সমস্যা যখন উঠে আসে, তখন সমাধানের প্রক্রিয়া খুবই ধীর। এখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা থাকে। ফাইল এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যায়। আইএমইডির রিপোর্টে এসব সমস্যার কথা বলা হয়। সমস্যা সমাধানে সব মন্ত্রীকে একসঙ্গে পাওয়াটাও কঠিন। একবার পরিকল্পনামন্ত্রী সিদ্ধান্ত ডিজিটাইজড প্রক্রিয়ায় প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটি করলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রস্তাব ও ডকুমেন্ট অনলাইনে সবার কাছে চলে যাবে। মন্ত্রীরা সেগুলো দেখে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এভাবে অনেক সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরিকল্পনামন্ত্রীর ওই প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি।

আমরা এডিপিকে দুটি ভাগ করতে পারি। এর একটি উত্তরাধিকার সূত্রে চলমান প্রকল্প। দ্বিতীয়টি এডিপিতে নতুন প্রকল্প। উচ্চ অগ্রাধিকার যেসব চলমান প্রকল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতিও ভালো, সেগুলোর জন্য সঠিকভাবে বরাদ্দ দিতে হবে। যেমন, পদ্ম সেতু এবং ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। এগুলোর জন্য যত টাকা প্রয়োজন দিতে হবে। তবে সেই সঙ্গে নতুন চালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সেই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রতিফলন সেভাবে নেই। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের এডিপিতে খাতওয়ারি বরাদ্দ বৃদ্ধির হারটি বিশ্নেষণ করলেই বোঝা যায়।

সামগ্রিকভাবে দেখলে আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমস্যার মাত্রায় কমবেশি হলেও আগামী অর্থবছরেও আমরা করোনার ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়েই যাব। অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার জন্য এডিপিতে কী রয়েছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। করোনা সংকট মোকাবিলায় সম্মুখসারিতে কাজ করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বরাদ্দ বৃদ্ধির হারে এক নম্বরে থাকার কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এটা আছে পাঁচ নম্বরে।

করোনায় অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। প্রচুর নতুন দরিদ্র পুরোনো দরিদ্রদের সঙ্গে যোগ হয়েছে। তাদের জন্য জীবিকা সহায়তা প্রয়োজন। তাদের কর্মসংস্থান ও সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এ বছর বরাদ্দ বৃদ্ধির হারে দুই নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল সামাজিক নিরাপত্তা। প্রকৃত অর্থে সেটা কতটা হয়েছে, সেটা দেখার বিষয়। করোনায় শেষ ভরসা হিসেবে আমরা দেখেছি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে। অনেকে শহর থেকে কাজ হারিয়ে গ্রামে গেছেন, বিদেশে থেকে ফিরে এসেও গ্রামে গেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রামে কর্মংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়নটা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাত বরাদ্দ বৃদ্ধির হারে তিন নম্বরে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু এটা আট নম্বরে চলে গেছে। বরাদ্দ বৃদ্ধির হারে চার নম্বরে থাকা উচিত ছিল শিক্ষা খাত। কিন্তু সেটি হয়নি। বিকল্প পদ্ধতি বা অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি ৭০ শতাংশ শিক্ষার সঙ্গে নেই। সাবান, পানি, মাস্ক সরবরাহ ও সামাজিক দূরত্বসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যায়, সেখানে তা করা এবং অন্য জায়গায় বিকল্প পদ্ধতিতে চালু করতে গেলে টাকার প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক লিড ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক

মন্তব্য করুন