বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে সরকার যে বরাদ্দ দেয়, তার উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় না। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ সমস্যা নয়। অর্থ থাকলেও সক্ষমতার অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। উন্নয়ন ব্যয়ের এ ধীরগতি বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আবু হেনা মুহিব

সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর নানা পদক্ষেপের ঘোষণা থাকলেও উন্নয়ন ব্যয়ের সামর্থ্য বাড়ানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই। জনসেবা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বছর শেষে বাস্তবায়ন হয় না। এ প্রবণতা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয় মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে। গত অর্থবছর এডিপি বরাদ্দের প্রায় ২০ শতাংশের মতো অবাস্তবায়িত ছিল। চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি আরও খারাপ। এর অন্যতম কারণ করোনা সংক্রমণ। তবে করোনার বাইরে এডিপি বাস্তবায়নে কাঠামোগত দুর্বলতার উন্নতি দেখা যায়নি। ফলে শুধু করোনাকে কারণ মনে করা ঠিক হবে না।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বা আইএমইডি এডিপি বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান তৈরি করে। আইএমইডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন হার অর্ধেকেরও কম। মূল এডিপি বিবেচনায় অর্থ ব্যয়ের হার আরও কম হবে। সংশোধিত এডিপিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। ব্যয়ের সামর্থ্যের এই দুর্বলতা নিয়ে সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ আছে। কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোও ফল দেয়নি।

কেন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উন্নয়ন ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না- এ নিয়ে প্রকল্প সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা কখনও জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কথা বলেন। কখনও বৈরী আবহাওয়ার কারণ দেখান। প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন বদলিও একটা কারণ। এসব কারণের মধ্যে এবার যুক্ত হয়েছে অতিমারি করোনা। তবে উন্নয়ন বিশ্নেষকরা বলছেন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবের কথা। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি না থাকা। প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হলে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন সক্ষমতা উন্নয়নের জন্যই আলাদা করে প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন। সমকালের সঙ্গে তিনি বলেন, সময়মতো এবং মানসম্পন্ন বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ এবং পরীক্ষিত জনবল নির্বাচন করা উচিত। মধ্যমেয়াদি বাজেটে কাঠামো (এমটিবিএফ) এবং ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস) সব ক্ষেত্রে কার্যকর করা। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে প্রকল্পের সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়, তা অর্জন হয় না। আবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে কয়েকগুণ। পদ্মা সেতুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় দাঁড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। শুধু বরাদ্দের অগ্রাধিকার নয়, বাস্তবায়নের মনোযোগেও সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে খুব একটা সুফল পাওয়া যায়নি। এর ভালো উদাহরণ হচ্ছে মেগা প্রকল্প। মেগা প্রকল্প বা ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের তালিকা করার পেছনে মূল ভাবনা ছিল, জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বড় কিছু প্রকল্পের তালিকা করে সেগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হচ্ছে তা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মনিটর করা এবং কোনো সমস্যা থাকলে যাতে দ্রুত সমাধান করা হয়- সেটা নিশ্চিত করা। এর মানে সবক্ষেত্রেই এগুলো হবে ফার্স্ট ট্র্যাক। অর্থায়ন, তদারকি, ক্রয়, ফলোআপ- সব কিছুই ফার্স্ট ট্র্যাক। পদ্মা সেতুসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে। ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বৃদ্ধি- এ দুই সূচক বিবেচনায় নিয়ে এসব প্রকল্পের সঙ্গে অন্য প্রকল্পের তুলনা করলে দুই ধরনের প্রকল্পের মধ্য দৃশ্যমান কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ছে।

এডিপি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একটি বড় ঘাটতি। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে যারা সম্পৃক্ত, তাদের অনেকেই নিজেদের কাজের বিষয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল নন। প্রকল্প নেওয়ার আগে এবং পরে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয় না। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা আছে। যথাযথ নকশা হয় না সব সময়। সম্ভাব্যতা যাচাই হয় নামকাওয়াস্তে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের পরও প্রকল্পের কাজ শুরু হতে কমপক্ষে ছয় মাস লাগে। কারণ, মন্ত্রণালয়গুলো বসে থাকে একনেকের বৈঠকের কার্যবিবরণী কখন হাতে আসবে। তারপর সরকারি আদেশ জারি হবে। তারপর মন্ত্রণালয়ে যাবে। এরকম অনেক ধাপ অতিক্রম করার অপেক্ষায় থাকে মন্ত্রণালয়।

বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রথমে শুরু হয় ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা। ভূমির সমস্যা সমাধান হলে ইউটিলিটি জটিলতা। বিদ্যুতের খুঁটি, পানির লাইন- এসব সরানোর কাজ। এসব দীর্ঘ জটিলতা শেষে নির্মাণ উপযোগী জমি পাওয়া অনেক সময় সাপেক্ষ বিষয়। এরপর ভুল বা অসম্পূর্ণ নকশা এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতায় মাঝপথে নকশা পরিবর্তন হয়। এরকম অনেক উদহারণ আছে, এক যুগ আগে নেওয়া দুই বছর মেয়াদের প্রকল্প এখনও শেষ হয়নি।

বছরের পর বছর একই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এর সমাধান কী হতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে আইএমইডি সচিব বলেন, প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিভিন্ন নির্দেশনা পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিপালন করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ধাপ কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যথাযথ নকশা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কঠোর কথা বলেছেন। এসব নির্দেশনা পরিপালন করতে হবে। সবাইকে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ :এডিপি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ আছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম প্রকাশনা মধ্যমেয়াদ সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতার অভাব সরকারের একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এডিপি বাস্তবায়ন সন্তোষজন হারে উন্নীত করতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে সংস্কার আনা হয়েছে। ছাড় প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রতি অর্থবছরের বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহারে ক্ষমতা প্রকল্প পরিচালকের হাতে দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দূর করা। দেশি উৎসের অর্থ ছাড়ের প্রথম থেকে চতুর্থ কিস্তিতে এখন আর সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। সব মন্ত্রণালয়ের জন্য এমটিবিএফ এবং আইবাস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আইএমডিকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন চিত্র :চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৪৯ দশমিক শুন্য ৯ শতাংশ। এ হার গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের এডিপির যে বরাদ্দ ছিল, তার এক লাখ ছয় হাজার ৫৪২ কোটি টাকা এখনও খরচ করা সম্ভব হয়নি। প্রতি মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে মোট বরাদ্দের একটা বড় অংশই এ বছর অ্যববহূত থেকে যাবে। এ বছর সংশোধিত এডিপিতে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল এডিপির তুলনায় বাস্তবায়ন হার প্রকৃত অর্থে আরও কম।

বড় বরাদ্দের ১৫ মন্ত্রণালয়ের কী অবস্থা :চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ১৫ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ৮৫ শতাংশ। এসব মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে। সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। করোনার কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছিল। সে ব্যয়ের প্রয়োজনও ছিল অন্য মন্ত্রণালয়ের চেয়ে বেশি। অথচ, গেল ১০ মাসে এ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে মোট বরাদ্দের মাত্র ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৪৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ মোট এডিপির ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

গত ১০ মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার ৩৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। বরাদ্দের বিপরীতে এ সময়ে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে তিন হাজার ৬২২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এ অর্থ এ বছরের মোট এডিপির ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। গৃহায়ন ও গণপূর্তের ব্যয় হয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল আট হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ এডিপির ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বৃহৎ ১৫ মন্ত্রণালয়ের বাকিগুলোর পরিস্থিতিও প্রায় অভিন্ন। এ তালিকায় রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও স্থানীয় সরকার বিভাগ।

গত ৫ বছরের বাস্তবায়ন চিত্র :২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার সংশোধিত এডিপির ৭৬ শতাংশ থেকে ৯১ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামার মধ্যে ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৯৪ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৮৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৯২ দশমিক ৭২ শতাংশ। মূল এডিপির বিবেচনায় বাস্তবায়নের হার আরও কম ছিল।

মন্তব্য করুন