সব দেশেই ব্যক্তির বিনিয়োগে বিকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুঃখজনক হলেও বাংলাদেশে ব্যক্তির বিনিয়োগে বিকল্প নেই বললেই চলে। আছে কেবল সরকারি সঞ্চয়পত্র বা জমি কেনা, যা আবার বাইরের অনেক দেশে নেই। প্রশ্ন হতে পারে, ব্যক্তির বিনিয়োগে অনেক বিকল্প থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, বিনিয়োগে যথেষ্ট সুযোগ বা বিকল্প না থাকলে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের স্পৃহা কমে যায়। আবার অনেক টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। সঞ্চয় বৃদ্ধি না পাওয়া এবং পাচারের কারণে দেশে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয় না। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও কাঙ্ক্ষিত হারে হয় না। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখন জানা দরকার, বাইরের দেশে ব্যক্তির বিনিয়োগে কী কী বিকল্প আছে। খুব জনপ্রিয় বিকল্প হলো হেজ ফান্ড। এটা অনেকটা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো। কোনো প্রতিষ্ঠান এমন ফান্ড করে অনেকের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে। এ ধরনের ফান্ড বাংলাদেশে নেই। অনেক দেশে স্বর্ণে বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশে মানুষ যেমন স্বর্ণালঙ্কার কেনেন, তেমন নয়। স্বর্ণের বার কেনেন বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারের মতো ব্রোকারদের মাধ্যমে কমোডিটি মার্কেট থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণ কেনেন। এ স্বর্ণ বিনিয়োগকারীর কাছে থাকে না। শেয়ারের মতো কোনো কাস্টডিয়ানের কাছে থাকে। বিনিয়োগকারীর কাছে থাকে শুধু ক্রয় সার্টিফিকেট। দাম বাড়লে বা প্রয়োজন হলে বিক্রি করে দেন। এখানে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের স্বর্ণে বিনিয়োগের ক্ষমতা আছে। চাইলে তারা বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংকেই রাখতে পারে।

বাংলাদেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বলে কিছু নেই। কারণ অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিতে ফসল ফলান। ফলে কৃষিপণ্যের মান সমান হয় না। আবার হলেও তা সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত গুদাম নেই। পণ্যের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য সার্টিফিকেট দেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নেই। বাইরের দেশে এটা আছে। সেখানে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে মানুষ চাল, গমও কিনতে পারেন। এক্ষেত্রে ফরোয়ার্ড মার্কেটও আছে। ক্রয়কৃত পণ্য আগাম বিক্রিরও বাজার আছে। যাদের অঢেল অর্থ আছে, তারা এ ধরনের বিনিয়োগ করতে পারেন। বাংলাদেশে সব পণ্যের না হলেও কিছু পণ্যের কমোডিটি বাজার হতেই পারে। এখানে চায়ের বাজার আছে। পাটের বাজার আছে। চাইলে চাল বা আম বা পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদি অনেক কমোডিটি শেয়ারবাজারের মতো কেনাবেচা হতে পারে। এটা করলে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা তৈরি হতো। কৃষিতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হতে পারত। এখানে ডিরাইভেটিভ বাজার নেই, বন্ড বাজার পর্যন্ত নেই। বিদেশে যে কেউ যেকোনো বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করতে পারে। আমাদের এখানে এটা রাখাই অবৈধ। বাংলাদেশের কোনো মানুষ যদি প্রতিবেশী ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কিনতে চায়, তা পারে না। কেউ যদি চায়, যুক্তরাষ্ট্র বা সিঙ্গাপুর বা জাপান বা হংকংয়ের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে, সে সুযোগ নেই। কিন্তু এসব দেশের মানুষ বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। দেশের বাইরে কিন্তু অনেকে অবৈধভাবে বিনিয়োগ করছে। দেশে বিনিয়োগের সুযোগ না পেয়েই সুদের হার ২-৩ শতাংশে নামার পরও মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে। মূল্যস্ম্ফীতি হিসাব করলে এখানে প্রকৃত আয় কম। তার পরও মানুষ নিরুপায়। কেউ কেউ জমি বা ফ্ল্যাট কেনে। খুবই কম সংখ্যক মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছে।

দেখা গেছে, যে দেশে ব্যক্তির বিনিয়োগের যত ভালো সুযোগ আছে, সেখানকার মানুষের সঞ্চয় প্রবণতাও তত বেশি। জিডিপির হিসাব কষলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ কোটি টাকা সঞ্চয় হচ্ছে। এটা কাগুজে হিসাব। অঙ্কের হিসাবে যে সঞ্চয় হওয়ার কথা, তা কোথায়? এ টাকা বিনিয়োগও হয় না, আবার ব্যাংকেও ডিপোজিট হয় না। তাহলে টাকাটা কোথায় যাচ্ছে। এ হিসাব কারও কাছে নেই। কারও খোঁজার ইচ্ছা আছে বলেও মনে হয় না।

বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়তে হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সব পথে সংযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষকে বাইরে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। বাইরেরটা দেখে দেশের মধ্যেও অনেক বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি করবে। ভালো বিনিয়োগ করে ভালো মুনাফা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের ইচ্ছা আরও বাড়বে। তখন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। মানুষের জীবনমান ও দেশ উন্নত হবে।

লেখক :অর্থনীতিবিদ

মন্তব্য করুন