মানুষ সঞ্চয় করে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য। সঞ্চয়ের অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করে ভালো মুনাফা পেতে চায়। কিন্তু উপায়? প্রচলিত বিনিয়োগের বাইরে কিছু অপ্রচলিত বিনিয়োগের বিষয়ে ধারণা মিলবে এ প্রতিবেদনে। লিখেছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

ব্যক্তির ক্ষুদ্র বিনিয়োগের কথা ভাবলেই প্রথমে আসে শেয়ারবাজারের কথা। কিন্তু এখানে বিনিয়োগ যেমন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি এ বিনিয়োগের জন্য চাই যথেষ্ট জ্ঞান। এর সঙ্গে চাই দক্ষতা, ধৈর্য এবং সময়। শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ করা গেলেও তা থেকে সহসা ভালো ফল মেলে না। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টাকার অঙ্ক যত বড় হয়, তত ভালো। অধিকাংশ মানুষের মাঝে এসবের সম্মিলন থাকে না বলে শেয়ারবাজার ভালো বিনিয়োগের বিকল্প এখনও হতে পারেনি। যদিও ঝুঁকির পাশাপাশি এখান থেকেই মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি।

তাহলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়িরা কি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবেন না? বিষয়টি তেমন নয়। নিজে না করেও পরোক্ষভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা সম্ভব। আসব সে কথায়। শুরুতে জেনে নেওয়া যাক, ব্যক্তির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী বিকল্প রয়েছে।

উন্নত বিশ্বে ব্যক্তির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যত বিকল্প আছে, বাংলাদেশে এখনও ততটুকু তৈরি হয়নি। যেমন ধরুন- কারেন্সিতে বিনিয়োগ, মানে নানা দেশের মুদ্রা কিনে রাখা। কারেন্সির বিনিময় মূল্যও ওঠানামা করে। দাম বাড়লে বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়া যায়। বাংলাদেশিদের কেউ কেউ গোপনে ও অবৈধ পথে এখানে বিনিয়োগ করছেন। এ জন্য সার্বিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক হাল-হকিকত বিষয়ে ভালো ধারণা রাখতে হয়। বাংলাদেশে এ বিনিয়োগের সুযোগ নেই। এর বাইরে কমোডিটি পণ্য যেমন- জ্বালানি তেল, গ্যাস, স্বর্ণ, নিকেল, কপার, সিলভার বা লোহাসহ নানা ধরনের ধাতু বা খাদ্যপণ্যেও বিনিয়োগ করা যায়। তবে ব্যক্তি সরাসরি এসব পণ্যে নিজে বিনিয়োগ না করে শেয়ারবাজারে লেনদেন হয় এমন কমোডিটিভিত্তিক শেয়ার বা ফিউচার বা অপসনস বা এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যায়। বলাই বাহুল্য, বিনিয়োগের এমন মাধ্যম বাংলাদেশে এখনও প্রচলন হয়নি।

তাই আমাদের প্রথাগত বিনিয়োগ বিকল্পেই ভরসা রাখতে হচ্ছে। এখানে বিকল্প হলো- সরকারি সঞ্চয়পত্র (জাতীয় বা ডাকঘর), ওয়েজ আর্নার্স বন্ড, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাংক আমানত বা এফডিআর। বিনিয়োগের এসব পণ্য বাংলাদেশে বেশি জনপ্রিয়। তবে এর বাইরে আরও দুটি বিকল্প রয়েছে। এর একটি হলো ট্রেজারি (সরকারি) বন্ড এবং ট্রেজারি বিল; যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো বেশি পরিচিত নয়। অন্য আর একটি হলো বীমা। অনেকেই ভাবছেন, বীমা কী করে বিনিয়োগ হতে পারে। সে বিষয়েও আলোচনা পরেই আছে। তার আগে জানিয়ে রাখি, আপনার জন্য আছে নতুন দুটি বিনিয়োগ বিকল্প। আর তা হলো বেসরকারি খাতের সুদভিত্তিক বা ছাড়কৃত মূল্যের বন্ড এবং ধর্মপ্রাণ মানুষদের জন্য 'সুকুক'। সুকুক এক ধরনের বন্ড। তবে মুনাফা দেওয়া হয় ইসলামী শরীয়াহ্‌ মোতাবেক, যেখানে সুদের কারবার নেই বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। আর ভাগ্যে বিশ্বাস থাকলে সরকারি প্রাইজবন্ডও আপনার বিনিয়োগের ছোট্ট কোনো বিকল্প হতে পারে। সরকারি ১০০ টাকা মূল্যের প্রাইজবন্ডে তিন মাস অন্তর লটারি হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে ১০০ টাকায় মিলতে পারে প্রথম পুরস্কার ছয় লাখ টাকা।

নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্র :যদি বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যক্তির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প কী- নিঃসন্দেহে তা সঞ্চয়পত্র। নির্দিষ্ট মুনাফা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তত মুনাফা পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে এখানে। সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে পেনসনার সেভিংস স্কিমে, যা মূলত অবসরপ্রাপ্তদের জন্য। এককভাবে ৩০ লাখ এবং যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায় এখানে। এর বাইরে যেসব সঞ্চয়পত্র সরকার বিক্রি করছে, সেগুলো হলো- ৫ বছর মেয়াদি, ত্রৈমাসিক মুনাফাভিত্তিক এবং পরিবার সঞ্চয়পত্র। এগুলোর মেয়াদ ৩ থেকে ৫ বছর। সুদের হার ৯ দশমিক ৩৫ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা করমুক্ত থাকলেও এখন ৫ শতাংশ দিতে হয়। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক বছরের কম সময়ে টাকা তুললে তাতে কোনো সুদ মেলে না। তবে এক বছরের বেশি সময় পর এবং মেয়াদপূর্তির আগে টাকা তুললে সুদের হার কমে যায়। তা ছাড়া এটা বিনিময়যোগ্য নয়। এর বাইরে পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও বিনিয়োগ করা যায়। পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংক অর্ডিনারি অ্যাকাউন্টসে বার্ষিক সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে এবং ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ সুদ মেলে পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট স্কিমে। এগুলোর মেয়াদ ৩ বছর। শুধু পোস্ট অফিসেই এসব কেনাবেচা হয়।

প্রবাসীদের জন্য যা আছে :প্রবাসীদের জন্য ভালো স্কিম রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ৫ বছর মেয়াদি ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, যার সুদহার ১২ শতাংশ। ছয় মাসের কম সঞ্চয়ে এখানে সুদ মেলে না। তবে ছয় মাস অন্তর সুদ তোলা যায় এবং পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এর বাইরে আছে ইউএস ডলার প্রিমিয়াম এবং ইনভেস্টমেন্ট বন্ড। ৩ বছর মেয়াদি এসব বন্ডে ইউএস ডলারে প্রবাসীরা যত ইচ্ছা তত বিনিয়োগ করতে পারেন। এর সুদের হার সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ। এসব বন্ডে বিনিয়োগ করমুক্ত।

ট্রেজারি বিল ও বন্ড :প্রতিবছর সরকার বাজেটের মাধ্যমে যে ব্যয় করে, তার পুরো সংকুলান রাজস্ব আদায় থেকে হয় না। প্রতিবছরই সরকারকে নতুন করে ধার করতে হয়। স্থানীয় উৎসের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ছাড়া ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে সরকার ধার করে। এখানে ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যক্তির বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিরাপদ। নূ্যনতম এক লাখ টাকা থেকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তবে সুদের হার সঞ্চয়পত্রের তুলনায় কম। আপনার যদি ব্যাংক হিসাব থাকে, তবে ব্যাংককে বললে ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দেবে। বলে রাখা ভালো, ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ ৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ বছর এবং ট্রেজারি বিলের মেয়াদ ৭ থেকে ৩৬৪ দিনের হয়ে থাকে। সরকারের চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলাম করে। এতে বিনিয়োগ করমুক্ত। বর্তমানে ট্রেজারি বিল-বন্ড ব্যাংকের মাধ্যমে কেনাবেচা হলেও অচিরেই শেয়ারবাজারে এর সেকেন্ডারি বাজার তৈরি হতে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, আপনি সহজেই শেয়ারের মতো ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

করপোরেট বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড ও সুকুক :সরকার যেমন বন্ড বিক্রি করে ধার করে, তেমনি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বা বেসরকারি কোম্পানি বা সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা বন্ড বিক্রি করে অর্থের প্রয়োজন মেটায়। বাইরের দেশে এটি খুব জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে মাত্রই শুরু হয়েছে। এতে ব্যাংক সুদের হার থেকে যথেষ্ট বেশি মুনাফা মেলে। প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়াদ শেষে পুরো অর্থ বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর সুদসহ আসল ফেরত দেয়। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দুটি করপোরেট বন্ডের একটি ইসলামী ব্যাংকের। এ বন্ড থেকে গত বছর ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ হারে মুনাফা মিলেছে। অপরটি সরকারি আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এটি এখনও মুনাফা দেয়নি।

আর সুকুক হলো শরীয়াহ্‌ বন্ড। এতে বার্ষিক মুনাফার হার নির্দিষ্ট নয়। যে প্রতিষ্ঠান বন্ড বিক্রি করে, তার মুনাফার ওঠানামার ওপর সুকুকের মুনাফার হারও ওঠানামা করে। সম্প্রতি বেক্সিমকো লিমিটেডের তিন হাজার কোটি টাকার শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য সুকুক বন্ড অনুমোদন করেছে বিএসইসি। এতে সর্বনিম্ন ৯ বা তার বেশি মুনাফা মিলবে। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি বন্ডও অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এ ধরনের বন্ড বিক্রি শুরু করলে বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মুক্ত হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষমতা ও ধার শোধের সংস্কৃতি দেখেই বন্ড কেনা উচিত।

মিউচুয়াল ফান্ড :শুরুতেই বলেছিলাম, নানা ঝুঁকি বিবেচনায় নিজে সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করে পরোক্ষও বিনিয়োগ করা যায়। এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো মিউচুয়াল ফান্ড। এভাবে অন্য অনেক বিনিয়োগের তুলনায় বেশি মুনাফা পাওয়া সম্ভব, যদিও তার গ্যারান্টি নেই। পরোক্ষে হলেও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি থেকেই যায়। তার ওপর সবার দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব সমান নয়। তাই যথেষ্ট দক্ষ ও পেশাদার সম্পদ বিনিয়োগকারীকে খুঁজে পেলে তবেই তার ব্যবস্থাপনাধীন ফান্ডে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, প্রতিবেশী ভারতেও সাধারণ মানুষ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। সেখানে এ বিনিয়োগ এতটাই জনপ্রিয় যে, কোথাও কোথাও পাড়ার মুদি দোকানেও মিউচুয়াল ফান্ড স্কিম কেনাবেচা হয়। বাংলাদেশে নির্দিষ্ট এবং অনির্দিষ্টকাল এই দুই মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। বছরে এসব ফান্ডে বিনিয়োগ থেকে গড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে মুনাফা মিলছে।

মার্চেন্ট ব্যাংক :শেয়ারবাজারে পরোক্ষ বিনিয়োগের আর একটি উপায় হলো মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পরোক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করা। একে বলা হয়, 'ডিসক্রিশনারি ইনভেস্টমেন্ট' অ্যাকাউন্ট। এর অর্থ হলো- মার্চেন্ট ব্যাংক তার সিদ্ধান্তে শেয়ারে বিনিয়োগ করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের পেশাদার বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক রয়েছেন। তারাই আপনাকে ভালো মুনাফা করিয়ে দিতে পারেন। প্রতিষ্ঠান ভালো হলে বছরে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। শেয়ারবাজার যত ভালো থাকবে, ততই মুনাফা বেশি। আবার খারাপ গেলে মুনাফা কমে যায়, লোকসানও হতে পারে।

বীমা :ব্যক্তির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও একটি ভালো বিনিয়োগ হলো বীমা। আমাদের সবার ভাবনায় বীমা মানেই হলো শুধু ঝুঁকি কমানোর একটা মাধ্যম। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় বীমার থেকে বড় বন্ধু আর হয় না। বীমার সুবিধা হলো, বিপদে ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি মেয়াদপূর্তিতে মুনাফাও পাওয়া যায়। বিভিন্ন বীমা কোম্পানির বাইরে সরকারি পোস্ট অফিসেও বীমা সুবিধা আছে।

মন্তব্য করুন