সমকাল :দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান এখন কতটা?

মাসুদুর রহমান :বর্তমানে দেশের জিডিপির ২৫-২৭ শতাংশ আসছে এসএমই খাত থেকে। বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের ৮০ শতাংশই এ খাতের। গত এক দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের অবদান বেড়েছে। ৭-৮ বছর আগে দেশে এসএমই প্রতিষ্ঠান ছিল ৭৮ লাখ, এখন নিশ্চয়ই তা কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ছোট দোকান থেকে শিল্পের যন্ত্রপাতি তৈরি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কর্মসংস্থানের বড় অংশই তৈরি করছে এই এসএমই খাত। এ কারণে সরকারও চাচ্ছে, এসএমই খাতের উন্নয়নে জোর দিতে।

সমকাল :বড় শিল্পে জোর না দিয়ে এসএমই উন্নয়নে বেশি জোর দেওয়ার

কথা বলছেন?

মাসুদুর রহমান : না, তা বলছি না। বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে বড় শিল্পের দরকার আছে। কিন্তু বড় শিল্প গড়তে হলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ছোট অনেক প্রতিষ্ঠান করতে হবে। এটা ছাড়া বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব নয়। একটি গাড়িশিল্পের কথাই ধরুন। একটি গাড়ি তৈরি করতে কয়েক হাজার যন্ত্রপাতি ও উপকরণ লাগে। পৃথিবীতে কোনো গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানি একা সব যন্ত্রাংশ ও উপকরণ তৈরি করে না। তারা ছোট অনেক কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নেয়, অনেক কোম্পানিকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়। জাপানে বড় শিল্পগুলো এভাবে কাজ করে; চীনেও তাই। আমরা যদি চীন, জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হতে চাই, তবে তাদের শিল্পায়নের মডেল অনুসরণযোগ্য হতে পারে।

সমকাল :চীন ও জাপানের জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসে এসএমই খাত থেকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তো অনেক পিছিয়ে।

মাসুদুর রহমান :ঠিক তাই। তবে এখন আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না, যদি বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে অনেক বেশি এসএমই প্রতিষ্ঠান গড়া না যায়। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ থেকে ৩২ শতাংশে উন্নীত করা। জাপান 'এক গ্রাম, এক পণ্য' এবং চীন 'এক অঞ্চল, এক পণ্য' নীতিতে এসএমই খাতের উন্নয়নে গত তিন দশকেরও বেশি সময় কাজ করে আজকের পর্যায়ে এসেছে। আমাদের বিসিক ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠা হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। এখন সরকার চায় সংশ্নিষ্ট সব সংস্থা একযোগে কাজ করে অঞ্চলভিত্তিক পণ্য নির্বাচন করে সেখানে ওই শিল্পের প্রসার করা। যশোরে এরই মধ্যে মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য যন্ত্রাংশ ও উপকরণ তৈরির অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে। গার্মেন্ট শিল্পের ৬০-৭০ শতাংশ প্রয়োজনীয় উপকরণ (এক্সেসরিজ) এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। আগে বাচ্চাদের খেলনার

প্রায় শতভাগ আমদানি হতো। এখন ৮০ শতাংশ দেশে হচ্ছে, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয়।

সমকাল :এসএমই খাতের উন্নয়নের পথে বড় কী বাধা দেখছেন?

মাসুদুর রহমান :ছোট ও মাঝারিশিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, এখনও প্রথাগত ব্যাংক ব্যবস্থা ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে চায় না। দিলেও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দেয়।

সমকাল :অর্থায়ন সংকট মেটাতে কী করছেন?

মাসুদুর রহমান :প্রথমত ব্যাংকগুলো যাতে সহজে অর্থায়ন করে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। এসএমই ব্যাংক নামে পৃথক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আছে। তবে বিকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। এ কারণে পুঁজিবাজারকে 'প্রধান অর্থায়ন বিকল্প' করার চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এরই মধ্যে এসএমই কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন করার জন্য সব ধরনের আইনি কাঠামো এবং শেয়ার লেনদেন ব্যবস্থা চালু করেছে।

সমকাল :এসএমই অর্থায়নে পুঁজিবাজার কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন?

মাসুদুর রহমান :এক কথায় অসীম। ব্যাংকগুলোর যেখানে অর্থায়ন করার ক্ষমতা শেষ, পুঁজিবাজারের সক্ষমতা সেখানে শুরু। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে চাইলে যে কোনো অঙ্কের এবং সংখ্যায় যত হোক তত কোম্পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। এখানে লাভজনক কোম্পানি এলে কারও টাকা তুলতে সমস্যা হবে না। দেশব্যাপী কোন কোন এসএমই কাজ করছে, তাদের অর্থের প্রয়োজন, সেসব তথ্য এসএমই ফাউন্ডেশনের কাছে আছে। এ তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জকে দেওয়া হবে। যেসব এসএমই প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থের প্রয়োজন তাদেরও বলব, পুঁজিবাজারে আসতে। দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জন্য ব্যাংক থেকে ব্যাংকে ঋণের জন্য ছোটাছুটি না করে স্টক এক্সচেঞ্জে যেতে বলব। এ ক্ষেত্রে যত ধরনের সহায়তা লাগে, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং স্টক এক্সচেঞ্জ তার সবটাই করবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

মন্তব্য করুন