সমকাল :অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমই খাত বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। পুঁজিবাজারেও এসএমই কোম্পানির জন্য পৃথক বাজার করা হয়েছে। কেন?

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ :এক কথায় উত্তর হলো- আর্থসামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য। আমাদের সবার ধারণা, সবচেয়ে ধনী ও বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর পুঁজি বেশি, তারা শুধু বৃহৎ শিল্প করে। এটা ঠিক, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ওইসব দেশে বেশি। কিন্তু জাপান, কোরিয়া, চীনের মতো দেশের জিডিপির ৬০-৭০ শতাংশই আসে এসএমই কোম্পানি থেকে। এসব দেশে এসএমই কর্মসংস্থানেও একই হারে অবদান রাখছে। অথচ আমাদের মতো দেশে পরিস্থিতি উল্টো। আমরা শুধু বড় শিল্প করার কথা চিন্তা করি। অথচ পশ্চাৎসংযোগ শিল্প হিসেবে ছোট ও মাঝারি শিল্প না গড়ে শুধু বড় শিল্পে সফল হওয়া যায় না। আগে এ ধারণা অনেকেরই ছিল না। এখন এ নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা। বড় শিল্পের মাধ্যমে যত সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান বাড়ে তার তুলনায় ছোট শিল্পে অনেক বেশি মানুষের জীবনধারা বদলে দেওয়া যায়।

দারিদ্র্য বিমোচনে এর প্রভাব অনেক বেশি। এ কারণেই এসএমই খাত এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সমকাল :কিন্তু এসএমই তো আছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, গৃহস্থালি পণ্য, প্লাস্টিক, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, হালকা প্রকৌশল, বিপণন ইত্যাদি ক্ষেত্রে লাখ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাহলে আর কোন এসএমই করার কথা বলছেন?

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ :আমাদের এসএমইগুলোর বেশিরভাগই ছোট দোকান, অর্থাৎ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান। উৎপাদনমুখী ও সেবামুখী এসএমইও আছে। তবে সংখ্যায় কম। এখানে কাউকে নতুন কিছু করতে বলা হলে পোলট্র্রি ফার্ম করার, মৎস্য খামার করার কথা সবার আগে আসে। এগুলো দরকার আছে। এর বাইরে আরও অনেক এসএমই হতে পারে। যেমন ধরুন মোটরসাইকেল শিল্প। কিছুদিন আগেও মোটরসাইকেলের পুরোটা আমদানি হতো। এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। এর পশ্চাৎসংযোগ শিল্প হিসেবে অনেক এসএমই হতে পারে, হচ্ছেও। যেমন, গার্মেন্ট শিল্পের এক্সেসরিজ নিয়ে অনেক এসএমই হয়েছে। এখন টিভি, ফ্রিজ থেকে শুরু করে অনেক ইলেকট্রনিক্স পণ্য বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। এগুলোর বহু এসএমই হতে পারে। সামনে গাড়ি নির্মাণশিল্পের জন্য, রিয়েল এস্টেট খাতেও অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প স্থাপনের সুযোগ আছে। অর্থাৎ প্রথাগত এসএমইর বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের এসএমই প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে।

সমকাল :এসএমই খাতের উন্নয়নে পুঁজিবাজার কীভাবে সহায়ক ভূমিকা

রাখতে পারে?

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ :পুঁজিবাজার হলো পুঁজি সরবরাহের বাজার। যখন কোনো উদ্যোক্তা মনে করবেন তিনি তার কোম্পানিকে আরও বড় করতে চান, কিন্তু তার কাছে যথেষ্ট অর্থ নেই, তখনই তিনি পুঁজিবাজারে আসতে পারেন। তিনি শেয়ার বিক্রি করে মূলধন নিতে পারেন। আবার ধার করতে চাইলে বন্ড ইস্যু করতে পারেন। এসএমই খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য আগে পুঁজি সরবরাহের কোনো আইন ছিল না, আলাদা বাজারও ছিল না। এখন সবই আছে। ৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার মূলধনি কোম্পানি চাইলে শেয়ার বিক্রি করতে পারে। তাদের জন্য আইনি কিছু শিথিলতাও আছে।

সমকাল :খুব ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য পুঁজি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কী?

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ :১০-২০ লাখ টাকার প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি টাকা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা এখনও নেই। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হলে কিছুটা বড় হতে হবে। এ বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য অন্তত ৫ কোটি টাকার প্রাথমিক মূলধন থাকার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে আমরা কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠানকে বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছি। তারা এসএমই প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে। এভাবে পরোক্ষ অর্থায়নের সুযোগ আছে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকে বেশ কিছু ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান খুব ছোট প্রতিষ্ঠানকেও ঋণ দিতে পারে। তবে কেউ যদি আরও কোনো উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে আসতে পারে, যার মাধ্যমে ক্ষুদ্র বা অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করা সম্ভব, তবে তা বিবেচনা করে দেখব।

সমকাল :এসএমই কোম্পানিগুলো কি মূলধন সংগ্রহ করতে আসছে?

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ :ইতোমধ্যে তিনটি কোম্পানি প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি করে এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আসলে শেয়ারবাজার থেকে এসএমই কোম্পানি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, এ তথ্য অনেকের জানা নেই। এ তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গত মাসেই এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ একটি সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। উদ্দেশ্যে হলো- পারস্পরিক তথ্য বিনিময় করা এবং এসএমই কোম্পানিগুলোকে পুঁজির প্রয়োজনে পুঁজিবাজারমুখী হতে আগ্রহী করে তোলা। আশা করছি, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হবে। পুঁজি সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। সুশাসন ও কমপ্লায়েন্স ইস্যুগুলো ভালোভাবে পরিপালন করা। অর্থাৎ পণ্যের মানের বিষয়ে আপস না করা। নিজেদের সুনাম বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া উচিত। তাহলে পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ আরও সহজ হয়ে যায়। মানুষ ওই কোম্পানির শেয়ার কিনতে বেশি আগ্রহী, যে কোম্পানির মালিক ভালো এবং কাউকে ধোঁকা দেন না।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

মন্তব্য করুন