রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা শেষে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার রোবট যান 'পারসিভিয়ারেন্স রোভার' গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাল গ্রহে সফল অবতরণ করল। মঙ্গল গ্রহজয়ী নতুন প্রজন্মের রোবটটি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন হাসান জাকির ও আসাদুজ্জামান



মহাকাশ গবেষণায় আরেকটি মাইলফলক গড়ল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা)। দীর্ঘ সাত মাসের কঠিন যাত্রা শেষে মঙ্গলে সফলভাবে অবতরণ করেছে নাসার রোবট যান 'পারসিভিয়ারেন্স'। দেশটির স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে রোবটটি মঙ্গলের জেজেরো বিষুবরেখা এলাকার ক্রেটারে অবতরণ করে। ওই গহ্বর বা ক্রেটারের নাম দেওয়া হয়েছে জেজেরো। পৃথিবী থেকে ৪৭ কোটি মাইল পথ অতিক্রম করে চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর অভিযান শেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাল গ্রহে নামে স্বয়ংক্রিয় এই যান। অবশ্য এর আগে রোবটিক এ যানটিকে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে ঢোকার আগে প্রায় সাত মাসে চার হাজার ৭২০ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এরপর ঘণ্টায় ১৯ হাজার কিলোমিটার গতিতে বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে এটি লাল গ্রহের পৃষ্ঠ স্পর্শ করেছে। নাসার নতুর রোবট পারসিভিয়ারেন্স রোভার নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। মার্স সায়েন্স ল্যাবরেটরির রোভার কিউরিওসিটির ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে পারসিভিয়ারেন্স রোভার। এটি কার গাড়ির সমান আকৃতির। বলা হচ্ছে, একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য যেসব অঙ্গ (পার্টস) দরকার পারসিভিয়ারেন্স রোভারের তা রয়েছে। মূলত মানুষের বিকল্প হিসেবেই সব ধরনের তথ্য দিতে পারে এভাবেই রোবটটিকে ডেভেলপ করেছেন নাসার গবেষকরা। মানুষের মতোই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি নিতে বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ রয়েছে রোভারটির। এর মধ্যে দেখার জন্য ক্যামেরা; স্পর্শ অনুভূতির জন্য বাহু, পা ও চাকা; স্বাদ ও গন্ধ নিতে কেমিক্যাল ও মিনারেল সেন্সর ও মাইক্রোফোন দেবে শ্রবণ অনুভূতি। পাশাপাশি এতে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিতে রয়েছে রেডিও আইসোটোপ পাওয়ার সিস্টেম। সিস্টেমটি প্লুটোনিয়ামের তেজষ্ফ্ক্রিয় ক্ষয়ের তাপকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সিস্টেমটিতে রয়েছে দুটি রিচার্জেবল লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। রোভারের পাওয়ার সিস্টেমটি টানা ১৪ বছর সচল থাকবে।

রোভারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশকে সুরক্ষিত রাখতে এতে রয়েছে শরীর তথা বডি। রোভারের কম্পিউটার ও তথ্য প্রসেসিং সিস্টেমকে বলা হচ্ছে মস্তিস্ক। রয়েছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। মানুষের মতো চারপাশ পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থে এতে ঘাড় ও মাথা সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ক্যামেরাকে বলা হচ্ছে চোখ আর মাইক্রোফোনকে বলা হচ্ছে কান। মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নুড়িপাথর ও মাটি সংগ্রহে রয়েছে সুবৃহৎ বাহু, চলাচলের জন্য রয়েছে চাকা ও পা। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চার্জিংয়ে রয়েছে ব্যাটারি আর যোগাযোগের জন্য রয়েছে অ্যান্টেনা।

মোটকথা পারসিভিয়ারেন্সে যুক্ত হয়েছে একগুচ্ছ নতুন প্রযুক্তি। রোভারটির বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে যুক্ত বিশেষ খনন যন্ত্রাংশের মাধ্যমে এটি মঙ্গলের শিলা ও ভূপৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে পারে। সংগৃহীত নমুনা এটি বিশেষ টিউবজাত করে সংরক্ষণও করতে পারে। এ ধরনের কাজ এর আগে কোনো রোবট করতে পারেনি।

উষ্ণ ইলেকট্রনিক্স বক্স

পারসিভিয়ারেন্স রোভার রোবটের বডি তথা শরীরকে বলা হচ্ছে উষ্ণ ইলেকট্রনিক্স বক্স (ওয়েব), যা অনেকটা প্রাইভেটকারের বডির মতো। রোভারের শক্তপোক্ত বডি ভেতরে থাকা কম্পিউটার এবং ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশকে বাইরের তাপমাত্রা ও আঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখে, এই কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশকে রোভারের মস্তিস্ক ও হৃদযন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। রোভারের উষ্ণ ইলেকট্রনিক্স বক্স একটি ডেক দ্বারা আবদ্ধ, এই ডেক সিস্টেম রোভারকে রূপান্তরযোগ্য কারে বদলে নিতে পারে। সিস্টেমটি ক্যামেরাকে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট স্থান থেকে রোভারের গতিবিধির পাশাপাশি চারপাশের ছবি ও ভিডিও নিতে সহায়তা করে। রোভারের উষ্ণ ইলেকট্রনিক্স বক্সের দৈর্ঘ্য ১০ ফুট, প্রস্থ ৯ ফুট ও উচ্চতা ৭ ফুট এবং ওজন এক হাজার ২৫ কেজি। এতে রয়েছে সুবৃহৎ ইলেকট্রনিক বাহু। বাহুর অগ্রপ্রান্তে রয়েছে ড্রিল মেশিন এবং জুম ফিচারসমৃদ্ধ ক্যামেরা। এই ক্যামেরা খুব কাছ থেকে মঙ্গলপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণে ছবি ও ভিডিও এবং প্রয়োজনে সেলফি তুলতে সক্ষম। এই বাহুর মাধ্যমেই নুড়িপাথর ও মাটি সংগ্রহ করবে রোভার।

সফটওয়্যার

রোভারকে ঠিকঠাক চালাতে নতুন এ মিশনের গবেষকরা নতুন সফটওয়্যার ডেভেলপ করেছেন। এই সফটওয়্যারটির উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি মিশন চলমান অবস্থায় হালনাগাদ হতে থাকবে। রোভারটি যেন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এজন্য স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে রোভারটি প্রয়োজন মতো বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করবে। প্রতিদিন কখন এবং কতটুকু কাজ করবে সেটিও রোভারটি ঠিক করে নিতে পারবে।

কম্পিউটিং মস্তিস্ক

মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মতো রোভারের মস্তিস্ক একটি বক্সে সুরক্ষিত রয়েছে। রোভার কম্পিউটার এলিমেন্ট (আরসিই) তথা কম্পিউটিং ডিভাইসটিকেই বলা হচ্ছে মস্তিস্ক। রোভারে অবশ্য দুটি মস্তিস্ক রয়েছে, যার একটি অকেজো হলে বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত রাখা। যে কোনো বিমান কিংবা মহাকাশযানে যে ধরনের কম্পিউটিং সিস্টেম থাকে এটিও অনেকটা সেরকম। বাড়তি হিসেবে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্নেষণ এবং নির্দেশনা পরিপালনে একে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রসেসর হিসেবে রয়েছে বিএই আরএডি ৭৫০ আর্কিটেচারের বিকিরণরোধী পাওয়ারপিসি ৭৫০, এটি ২০০ মেগাহার্টজ গতিতে পরিচালিত হয়, যা এর আগে মঙ্গলে পাঠানো রোভার স্পিরিট ও অপরচুনিটিজ কম্পিউটারের ১০ গুণ বেশি। রয়েছে ২ জিবি ফ্ল্যাশ মেমোরি, ২৫৬ মেগাবাইট র‌্যাম এবং ২৫৬ কিলোবাইটস রম, যা আগের রোভারের তুলনায় ৮ গুণ বেশি। এতে রয়েছে একটি ইন্টারন্যাল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ), যাতে এটি উল্লম্ব, আনুভূমিক কিংবা পাশাপাশি গড়িয়ে গড়িয়ে যে কোনোভাবে সমান গতিতে চলতে পারে। মস্তিস্কের গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মঙ্গল গ্রহের অতিরিক্ত ঠান্ডা কিংবা গরমে যেন রোভার অকেজো না হয়ে যায় সেটি নিশ্চিত করা। মঙ্গলপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেটিই হোক না কেন রোভার সিস্টেমটিকে সব সময় সহনশীল তাপমাত্রায় রাখা, বিদ্যুতের মাত্রা ঠিক রাখা- মানে রোভারটিকে প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি সচল রাখার কাজটি করে মস্তিস্ক। পাশাপাশি নিজে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পৃথিবীর সঙ্গে রোভারের যোগাযোগ, ছবি ও ভিডিওসহ যাবতীয় তথ্য বিনিময়ের কাজটিও মস্তিস্কের।

ক্যামেরা

পারসিভিয়ারেন্স রোভারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশগুলোর মধ্যে ক্যামেরা অন্যতম। এতে রয়েছে ২৩টি বিশেষায়িত ক্যামেরা, যার মধ্যে প্রকৌশল কাজের ক্যামেরা ৯টি, বৈজ্ঞানিক কাজের জন্য ৭টি এবং অন্যান্য প্রয়োজনে ৭টি ক্যামেরা। এর মধ্যে ছয়টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা শনাক্তকারী ক্যামেরা, যা একেবারেই নতুন করে ডেভেলপ করা হয়েছে। রোভার চলাচলের সময় সামনে-পেছনে বড় পাথর, গর্ত কিংবা এরকম প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা তা চিহ্নিত করতে এই ক্যামেরা ভূমিকা রাখে। এছাড়া কোন পথ দিয়ে চলাচল করবে সেটি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত রোভারটি দুটি নেভিগেশন ক্যামেরা ব্যবহার করছে। নমুনা সংগ্রহ ও সেগুলোর ছবি তোলার জন্য রয়েছে ক্যাশক্যাম। এছাড়া মাস্টক্যাম জেড, সুপারক্যাম, পিক্সেল, সারলক, ওয়াটসন ক্যামেরাগুলো বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। শক্তিশালী জুম লেন্সসমৃদ্ধ মাস্টক্যাম জেড রঙিন ছবি ও ভিডিও নেয়, সুপারক্যাম লেজার রশ্মির মাধ্যমে পানির উৎস সন্ধান করবে, রাসায়নিক উপাদান বিশ্নেষণে পিক্সেল এক্স-রে ব্যবহার করবে, বর্ণালি বিশ্নেষণে শেরলক এবং ওয়াটসন থাকবে রোভারের বাহুর একেবারে অগ্রপ্রান্তে। এসব ক্যামেরার কয়েকটি মঙ্গলগ্রহে রোভারের চমৎকার অবতরণে ভূমিকা রেখেছে। এই যে আমরা এখন নাসার মাধ্যমে রোভার অবতরণের যেসব ছবি ও ভিডিও দেখছি তা এইসব ক্যামেরাতেই তুলে পাঠিয়েছে রোবটটি। ২০ মেগাপিক্সেল এবং ৫১২০ বাই ৩৮৪০ পিক্সেলের, বহুমাত্রিক কাজে পারদর্শী একগুচ্ছ ক্যামেরা নতুন রোভারের অবতরণের অসাধারণ ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছে।

মাইক্রোফোন

রোভারে রয়েছে দুটি মাইক্রোফোন। এর আগে নাসার দুটি মিশনের একটিতে মাইক্রোফোন যুক্ত থাকলেও সেটিকে কাজে লাগানো যায়নি। রোভারের মাইক্রোফোন মঙ্গল গ্রহে কী০ ধরনের শব্দ উৎপাদন হচ্ছে তা জানতে সহায়তা করবে নাসার গবেষকদের। পাশাপাশি রোভার ল্যান্ডিংয়ের যে শব্দ এবার ভিডিওতে পাওয়া গেছে সেটিও এই মাইক্রোফোনেরই অবদান। া

মন্তব্য করুন