স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ফুটবল-ক্রিকেটের বদলে বেছে নিচ্ছে অনলাইনভিত্তিক মোবাইল গেমস। বিশেষ করে ফ্রি ফায়ার এবং পাবজি গেমের আসক্তি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিশোরদের এ ভয়ংকর আসক্তি থেকে ফেরানো না গেলে জাতিকে কড়া মাশুল গুনতে হতে পারে। লিখেছেন হাসান জাকির

মাগুরা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে আমুড়িয়া। পিচঢালা রাস্তার দু'পাশে সবুজের অভিবাদন নিয়ে ঈদের ছুটিতে পৌঁছে যাই আমুড়িয়ায়। ছায়াঘেরা মায়াঘেরা এই গ্রামের বিকেলগুলো একটু অন্যরকম। এখানকার কিশোর-তরুণরা বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ূয়ারা বিকেলে সন্ধ্যায় এমনকি রাতেও মাঠে, বাজারে, স্কুলের সিঁড়িতে কিংবা শহীদ মিনারে দল বেঁধে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। কৌতূহল নিয়ে কাছে গেলে দেখা যায়, প্রত্যেকের হাতেই স্মার্টফোন! স্মার্টফোন স্ট্ক্রিনে চলছে ব্যস্ত আঙুল। জিজ্ঞেস করলে স্ট্ক্রিন থেকে নজর না সরিয়েই এক কিশোর উত্তর দেয়, তারা 'ফ্রি ফায়ার' গেম খেলছে। স্থানীয় আমুড়িয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবিল (ছদ্মনাম) জানায়, মাল্টিপ্লেয়ার এ গেম অনলাইনে খেলতে হয়। গ্রামের খেলার মাঠে ফুটবল-ক্রিকেট নেই! বরঞ্চ খেলার মাঠে গাদাগাদি করে বসে মোবাইল ফোনে গেম খেলার চিত্র দৃশ্যমান। এই গেম খেলার জন্য শুধু মোবাইল ইন্টারনেট কেনার জন্যই তাকে ৩০০ টাকা ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি গেমে প্রতিযোগীদের হারিয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে বিভিন্ন উপকরণ (যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, চরিত্র প্রভৃতি) কিনতেও (ইন গেম পারচেজ) অনেকে টাকা খরচ করে।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে খেলা এই গেমের উপকরণ সরাসরি কিনতে হলে ক্রেডিট কার্ডে ডলার কিংবা পেপালের মতো কারেন্সি থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি গুগল প্লেস্টোরে অ্যাকাউন্টও থাকা প্রয়োজন। এ কিশোরদের তো এসব নেই, তাহলে তারা গেমের উপকরণ কিনছে কীভাবে? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গেমের উপকরণ সহজে বিক্রির জন্য তৈরি হয়েছে একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। এরা ফেসবুকে গ্রুপ ও পেজ খুলে বিকাশ এবং নগদের মাধ্যমে এসব উপকরণ বিক্রি করছে। তবে অনলাইন গেমিংয়ে কিশোরদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম হচ্ছে 'পাবজি'। বিনামূল্যে ডাউনলোডযোগ্য গেমটির রয়েছে মোবাইল এবং লাইট সংস্করণ। মূলত দেশের কিশোরদের কাছে এখন পাবজির পরই ফ্রি ফায়ার গেম সবচেয়ে প্রিয়। তবে পাবজির স্থান ধীরে ধীরে দখল করছে ফ্রি ফায়ার। শুধু মাগুরার প্রত্যন্ত গ্রামটিতে নয়, দেশের আনাচে-কানাচে সব শ্রেণির কিশোরকে চুম্বকের মতো টানছে ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করার ধুন্ধুমার মারামারির রয়েল ব্যাটেলধর্মী এ গেমস। মূলত স্কুল-কলেজ বন্ধের সুযোগে শিশু-কিশোররা এ ধরনের সহিংস গেমে আসক্ত হয়ে উঠছে।

সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এবং বেসিসের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরের ঘাঘটিয়ায় যান। গ্রামের অভিজ্ঞতা ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন 'গ্রামের দোকানে দেখছি ভীষণ ভিড়। কাজে যেতে দেখি একদল কিশোর ফ্রি ফায়ার নামক গেম খেলছে। জানতে পারলাম বিকাশে টাকা পাঠিয়ে গেম খেলার জন্য 'ডায়মন্ড' (ডায়মন্ড কয়েন) কিনতে হয়। তখন মেজাজটা খারাপ হলো। তিনি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে ট্যাগ করে প্রশ্ন রাখেন, 'কারা এই টাকা নিচ্ছে, কর্তৃপক্ষ কি কিছু জানে? মাননীয় মন্ত্রী কিছু একটা করেন।' নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মাগুরার ইসলামী কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান টিটু সমকালকে বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা গেম খেলার নেশায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যাদের মোবাইল ফোন নেই, তারা যে কোনো মূল্যে মোবাইল ফোন পেতে চাপ দিচ্ছে। সামর্থ্য না থাকলেও ফসল কিংবা গবাদি পশু বিক্রি অথবা জমি বন্ধক রেখেও সন্তানকে স্মার্টফোন কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা। এরপর নেট কেনাসহ গেম খেলার টাকা পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে তারা। পড়ার টেবিলে না বসে তারা স্মার্টফোনে সময় কাটাচ্ছে। তাদের বাধা দিতে গেলেও অসম্মানিত হওয়ার ভয় থাকে। মেধাবী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আগামী প্রজন্ম তৈরিতে এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। তিনি এ ধরনের গেমস নিষিদ্ধের দাবি জানান।

বিশ্বজুড়ে রমরমা বাণিজ্য

অনলাইন ভিত্তিক সহিংস গেম বিশ্বজুড়ে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে। বিশেষ করে কিশোরদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জরিপ প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার এক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে শীর্ষে থাকা পাবজি আয় করেছে ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ফ্রি ফায়ার আয় করেছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, কল অব ডিউটির মোবাইল সংস্করণ আয় করেছে ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার, নাইভস আউট আয় করেছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

দেশে নিষিদ্ধ হচ্ছে না ফ্রি ফায়ার ও পাবজি

ফ্রি ফায়ার ও পাবজির আসক্তি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বীকার করে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান,'কিশোরদের গেমিং আসক্তি রোধে মূল চাবি অভিভাবকদের কাছেই আছে। এ জন্য অভিভাবকদের সচেতন হবে, 'প্যারেন্টাল কন্ট্রোল' বিষয়টি বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিয়ে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কাজ করব। তবে কোনো গেম বন্ধ করার নির্দেশনা আমার কাছে নেই। আবার বন্ধ করলেও খুব বেশি লাভ নেই। কেননা ভিপিএনসহ বিকল্প নানা উপায়ে ঠিকই গেম খেলা চলবে। সরকার গেমিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে বড় বিনিয়োগ করছে উল্লেখ করে সমকালকে তিনি বলেন, 'ওরা যদি গেমস না খেলে তবে গেমস বানাবে কীভাবে? আপাতত এসব গেমস বন্ধ হচ্ছে না।' গেম সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এক-দুইটা গেমস বন্ধ করে শিশু-কিশোরদের গেমিং আসক্তি রোধ করা যাবে না। পাবজি কিংবা ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইনে অসংখ্য গেমস রয়েছে। সেগুলো থেকে কিশোররা নতুন গেমস বেছে নেবে। কাজেই বন্ধ না করে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে গেমিং বিধি তৈরি করা যেতে পারে। এমন আইনের মধ্যে রয়েছে ১৩ বছরের কম বয়সীরা গেমস খেলার জন্য নিবন্ধন করতে পারবে না, ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত দিনে এক বা দুই ঘণ্টা গেমস খেলতে পারবে। এ রকম পলিসি তৈরি করে কিশোরদের গেমিংয়ের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি অনলাইনে ক্লাসের সুবাদে এখন প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে।

শিশু-কিশোরবান্ধব কনটেন্ট তৈরি করে এসব ডিভাইসের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

মন্তব্য করুন