টেকলাইন

টেকলাইন

শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট

অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

দেশের শিশুরা ইন্টারনেটে ঠিক কী করছে, কোন বয়সীরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কেমন- এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি জরিপ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ। 'বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা' শিরোনামে ইউনিসেফ বাংলাদেশ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। জরিপে উঠে এসেছে ইন্টারনেটে শিশুদের মারাত্মক ঝুঁকির কথা। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী। লিখেছেন হাসান জাকির


দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। ২০০০ সাল থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০০ গুণ বেড়েছে। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ এবং শিশু। এজন্য অনলাইন ব্যবহারকারীদের গড় বয়স ক্রমেই কমছে। দেশের শিশুরা ইন্টারনেটে ঠিক কী করছে, কোন বয়সীরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কেমন- এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি জরিপ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ। 'বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা' শিরোনামে ইউনিসেফ বাংলাদেশ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ূয়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে এমন এক হাজার ২৮১ জন (১০ থেকে ১৭ বছর) শিশুর ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার বিষয়টিও সমীক্ষায় উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ১০ শতাংশ শিশু ধর্মীয় উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করে। কিশোর বয়সীরা (১৬ থেকে ১৭ বছর) অন্য বয়সী শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি এ ধরনের উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়।

এ জরিপে দেখা যায়, ১১ বছরের কম বয়সী শিশুরাও প্রতিদিন ইন্টারনেটে প্রবেশ ও ব্যবহার করছে। যদিও ছোট শিশুদের তুলনায় বেশি বয়সী শিশুরা অনলাইনে ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে ক্ষতিকর সামগ্রী, যৌন নিগ্রহ ও অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে শিশুরা কখনোই মুক্ত নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু (১০-১৭ বছর বয়সী) ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ ছাড়া শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩ শতাংশ) প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে তাদের নিজেদের কক্ষটিকেই ব্যবহার করে। এটা 'বেডরুম কালচার'-এর ব্যাপকতা নির্দেশ করে, যা অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশে উচ্চমাত্রায় অনলাইনে প্রবেশাধিকারে সুযোগ ও ব্যবহারের দিক থেকে ছেলেরা (৬৩ শতাংশ) মেয়েদের (৪৮ শতাংশ) চেয়ে এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডি দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ তাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই অনলাইন 'বন্ধুদের' সঙ্গে সরাসরি দেখা করার কথাও স্বীকার করে।

জরিপমতে, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। অনলাইনে হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অনলাইনে অনির্দিষ্টকাল ধরে এগুলো থেকে যেতে পারে। অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় যারা অনলাইনে ভয়ভীতির শিকার হয়, তাদের অ্যালকোহল ও মাদকে আসক্ত হওয়ার এবং স্কুল ফাঁকি দেওয়ার হার বেশি। এ ছাড়া তাদের পরীক্ষায় ফল খারাপ করা, আত্মসম্মান কমে যাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। চরম পরিস্থিতিতে, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট

শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। শিশুর ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, ইন্টারনেট কোনো গোপন জিনিস নয় যে বদ্ধ ঘরে দেখতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে যেন শিশু নির্দি্বধায় তার সবকিছু অভিভাবকের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, এতে যেন কোনো সংকোচ বোধ না থাকে। শিশু ইন্টারনেটে কী করছে বা কী শিখছে, তা গল্পচ্ছলে জেনে নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি জরুরি। এখন নানা ধরনের সফটওয়্যার (অ্যান্টিভাইরাস) পাওয়া যায়, যাতে ইন্টারনেটে শিশুর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা যায়। আবার শিশু কী কনটেন্ট দেখবে, তাও নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কার্টুন, ভিডিও দেখাসহ ইন্টারনেট ভিত্তিক নানা ধরনের আসক্তি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে এসব শিশুর মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ইন্টারনেট কনটেন্ট দেখায় লাগাম টানতে হবে। দিনে এক-দুই ঘণ্টার বেশি যেন তারা ইন্টারনেটে ভিডিও না দেখে তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার বলেন, 'বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা আমরা শুনেছি এবং তারা যা বলছে তা পরিস্কার- ইন্টারনেট একটি নির্দয় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য অনলাইনে শিশুদের প্রতি আরও আন্তরিক এবং সদয় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সবার জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণও জরুরি।'

দেশের শিশুদের নিয়ে ইউনিসেফের জরিপ
 
-ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৩২ ভাগ শিশু চরম ঝুঁকিতে রয়েছে;
 
-২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ইন্টারনেটে প্রবেশ করছে;
 
-৬৩ শতাংশ শিশু বেডরুমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে;
 
-ইন্টারনেটে শিশুরা বেশিরভাগ সময় চ্যাটিং ও ভিডিও দেখে;
 
-শিশুদের মধ্যে ছেলেদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশি (৬৩ শতাংশ);
 
-৭০ ভাগ ছেলে ও ৪৪ ভাগ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিতদের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে।