বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে ধর্ম তাদের প্রভাবিত করে। কিন্তু এক শ্রেণির আলেম-ওলামার মনে দেশে ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা চালুর আবেগ সংবরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা হয়তো ভাবেন, যে দেশটির জনসংখ্যা বিপুলভাবে ধর্মপ্রাণ, সে দেশের ধর্মীয় নেতা হিসেবে তারা যা চাইবেন তা-ই করতে পারবেন! সম্ভবত এমন মনোভাব থেকেই তারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করেন, যা দুর্ভাগ্যজনক।
কিন্তু সংকট হচ্ছে, এই শ্রেণির উচ্চাভিলাষী একবারের জন্যও ভাবেন না, একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালিত হয় দেশের সংবিধান, পার্লামেন্ট, আইন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আলোকে; কোনো বিশেষ ধর্মবেত্তাদের হুজুগে নয়। কারণ ধর্মচর্চা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির। তা সমাজ বা রাষ্ট্রের একেবারেই নয়। অতি সম্প্রতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটানো হয়েছে। অথচ মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, যে ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ বন্ধু। মোদির রাজনৈতিক দর্শন ভারতেরও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু ভারতের গণমানুষ তাদের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক; আমরা নই। প্রশ্ন হচ্ছে, মোদি ২০১৫ সালেও বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন কেউ কিছু বলেননি। এবার যেহেতু উপলক্ষটা ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, অতএব পরিস্থিতি তাতিয়ে তোলা হলো। চালানো হলো সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহ তাণ্ডব। অতএব প্রশ্ন উঠবেই- যারা এর পৃষ্ঠপোষক-পরামর্শদাতা, তারা নিশ্চিতভাবেই বাঙালির দুটি ঐতিহাসিক লগ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তারা হয়তো ভুলে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরার নতুন যুক্তিও পাওয়া গেছে।
প্রায় বিশ্বজুড়েই বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক হেফাজতি তাণ্ডব নিয়ে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- বাংলাদেশে কি ইসলামিক মৌলবাদী উত্থান ঘটানোর মহড়া চলল? যদি তা-ই হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কী? বিশ্বের বহু গণমাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক সহিংসতাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধর্মীয় মৌলবাদীদের ক্ষমতা দখলের মহড়া বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি মনে করি, এসব পর্যালোচনা সর্বাংশে সঠিক নয়। তবে এ তাণ্ডবের পেছনে দৃশ্যত কিছু যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করা যায়। কারণ হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটি নিজেকে অরাজনৈতিক দাবি করলেও তাদের কার্যক্রর্মে পরিস্কারভাবে রাজনীতি সুস্পষ্ট।
এই জনপদে হাজার বছর ধরে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান একত্রে বসবাস করেছে। এই বঙ্গের সৌহার্দ্যের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এশিয়ার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম বাঙালি জাতি। প্রতিটি ধর্মের মানুষ এ অঞ্চলে চিরকাল সম্প্রীতিতে বসবাস করেছে; গড়ে তুলেছে নিজস্ব কৃষ্টি ও সভ্যতা। পার হয়েছে শশাঙ্ক, পাল, সেন, সুলতান, মোগল, বারোভূঁইয়া ও নবাবের আমল। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার আমলে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাচার করেছে স্বাধীনভাবে। মুসলমান সুফি-সাধকদের আধ্যাত্মিকতা গণমানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদরা রোপণ করেছে বিভক্তির বিষ। ফলে বিভাজিত হয়েছে মানুষ। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে উপনিবেশমুক্ত ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোতে বাঙালি জনগোষ্ঠী নিপীড়িত হতে থাকে। ক্রমে গড়ে ওঠে জনবিদ্রোহ। সামনে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘটে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। লাখ লাখ শহীদের রক্তে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয় এবং ৫০ বছর পরও এ কথা সদম্ভেই বলা যায়- আমাদের গণমানুষের জীবনচেতনা চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতিকেই আঁকড়ে আছে; কখনোই তা ধর্মকে অস্বীকার করেনি।
কিন্তু হেফাজতে ইসলাম এবং কিছু উগ্র ধর্মবাদী গোষ্ঠী, বিশেষত যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষ ধারণ করেছিল তথাকথিক 'ধর্ম রক্ষার নামে'; এরা একদিকে নিজেদের অরাজনৈতিক বলে দাবি করে, অন্যদিকে সুকৌশলে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্থনীতির অঙ্গনগুলোকে গ্রাস করার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন? এটা কি ধর্মে, তাদের ভাষায় 'বিশুদ্ধতার প্রবর্তন' চেষ্টা, নাকি এর পেছনে কোনো বিদেশি মহলের মদদ আছে? কারণ মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেও পাকিস্তান যে আজও বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য স্থাপন করতে চায়, মনের মতো সরকার চায়- তার প্রমাণ তারা বারবার রেখেছে। অতএব, ১৯৭১-এর মতোই ধর্মকে জঙ্গিবাদী করার চেষ্টা চলেছে। মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়ালেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আঘাত আসছে। আক্রমণ ঘটছে বিদেশিদের ওপরেও। আগে মনে করা হতো, কেবল দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিবাদে দীক্ষা দেওয়া হয়। সে চেহারারও বদল ঘটেছে। শহুরে সুবিধাভোগী শিক্ষিত পরিবার থেকেও জঙ্গিতে নাম লেখাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে মগজ ধোলাই হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
না, কিছুতেই বলা উচিত হবে না- সব আলেম-ওলামা এসব অপকর্মে আছেন। আছেন চিহ্নিত কিছু মানুষ। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রক্তাক্ত পট পরিবর্তনের পর থেকে ১৫ বছর ধরে চলল প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ সেনা শাসন। রাজনীতি ও সমাজজীবনে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের সংকট বাড়তে থাকল। মুসলিমপ্রধান দেশে ধর্মশিক্ষা বা মাদ্রাসা নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে যেখানে সরকার অনুমোদিত মাদ্রাসা ছিল ১৮৩০টি; সেই সংখ্যা ১৯৯০ সালে এসে দাঁড়াল ৫৭৯৩। অথচ এদের শিক্ষা কার্যক্রম চলল অনিয়ন্ত্রিতভাবে। সংবিধানের দুটি বড় ভিত্তি ধর্মনিপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে কর্তন করলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদ নিজেদের রাজনীতির সুবিধার্থে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে ধাবিত হলো। এরই মধ্যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান থেকে বাঙালি জিহাদিরা দেশে ফিরতে শুরু করল। পরিস্থিতি নতুন মাত্রা লাভ করল। ২০০১ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়া যে সরকার গড়লেন, সে সরকার হুজি ও জেএমবির পৃষ্ঠপোষকতা করল। প্রথমদিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও বিদেশি চাপে কিছু জঙ্গিদের ধরা হলো। বিচারও হলো। বলা সংগত হবে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করল। কিন্তু প্রায় দুই যুগ ধরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পরিকল্পিত পুনর্বাসনে প্রশাসন ও সমাজস্তরে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে সহজে পাল্টানো গেল না। এরই মধ্যে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধের কিছু শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন হলো। বিচারের শুরুতেই ২০১০ সালে জন্ম নিল হেফাজতে ইসলাম নামে সংগঠনটি। চলল ধর্মের নামে সহিংস পদচারণা। যে ১৩ দফা দাবি নিয়ে তারা এলো, তার বেশিরভাগই দেশের বিদ্যমান আইন ও সংবিধানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা। তারা শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টানোর দাবি তুলল। ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তনের দাবি জানাল। না, তাদের পদচারণায় দেশে শরিয়তি শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়নি ঠিকই, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের উদর থেকে জন্ম নেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো ক্ষতিগ্রস্তু হলো। কিছু সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল আবার এদের গোপনে পৃষ্ঠপোষকতা করল। এসবের পেছনে লুকিয়ে থাকল ১৯৭১ সালে বাঙালি জনতার কাছে পাকিস্তানি স্বৈরকাঠামো পতনের ইতিহাস। প্রয়োজন বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করা। প্রয়োজন ধর্মের শাশ্বত আবেদনকে রক্ষা করে মতলবি ধর্ম-রাজনীতিকে প্রতিরোধ করা।
লেখাটি শেষ করার আগে একটি মন্তব্য রাখতে চাই। কেউ কেউ স্বভাবতই প্রশ্ন করবেন- সাংবিধানিক বা গণতান্ত্রিক রীতির বদলে উগ্রপন্থার যে 'বিপ্লব'-এর মহড়া দেখা গেল; এই বঙ্গের মাটিতে আখেরে কি তা সফল হতে পারবে? সম্ভাব্য সব অর্থেই বলা যায়- না। এর সফলতার কোনোই কারণ নেই। কারণ বাঙালি মুসলমান একদিকে যেমন পাকিস্তান-আফগানিস্তানের জনগোষ্ঠী নয়; তেমনি নয় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানও। তারা নিশ্চিতভাবেই ধর্মপ্রাণ। কিন্তু তাদের আছে ভাষা-সংস্কৃতি-শিল্পকলা-সাহিত্যের এমন গৌরবময় ঐতিহ্যশক্তি, যা তাদের স্বাতন্ত্র্য ও আলাদা শক্তি দিয়েছে। এর পরও বাঙালির আছে সুবিশাল মুক্তিযুদ্ধ, যা যে কোনো অশুভ আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম। ধর্ম-রাজনীতির ইত্যাকার তৎপরতা হয়তো রাষ্ট্রীয় প্রগতির পথে সংকট তৈরি করবে, যা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু বাঙালির গৌরব জাতীয় শক্তিকে পরাস্ত করতে পারবে না; কিছুতেই না।
  মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও বিশ্নেষক

বিষয় : সমকালীন প্রসঙ্গ

মন্তব্য করুন