গত ২ মে এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে পুনরায় আশ্বস্ত করেছেন, দেশবাসীর জন্য তিনি টিকার সুব্যবস্থা করবেন। করোনা মহামারিতে শেখ হাসিনা তার সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনায় দেশের জনগণের জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। উন্নত দেশের অনেকেই যখন ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, তখন প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রয়াসে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন চলে আসে; এ এক অভাবনীয় সাফল্য। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাস সারাবিশ্বে মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার হুর নির্দেশিত মতামতগুলোই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই এই মহামারি সামলে নিয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাকাকেও সচল রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে গৃহীত পদক্ষেপ

চীনের উহান প্রদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই করোনা মোকাবিলায় দেশের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় গতিশীলতা আনার জন্য ২৬ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। উন্নত কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নতুন করে ৪০০০ জন চিকিৎসক, ৫০৫৪ জন নার্স, ১২০০ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ১৬৫০ জন মেডিকেল টেকনিশিয়ান, ১৫০ জন কার্ডিওগ্রাফারসহ কয়েক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ৪২১৭ জন চিকিৎসককে করোনাভাইরাস সংক্রমণ-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবা প্রদানের জন্য হটলাইনে যুক্ত করা হয়েছে। করোনাকালে চিকিৎসাব্যবস্থা সমন্বিতভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি জাতীয় কমিটি এবং প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে সভাপতি করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হয়। দেশে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা ১৫৬টিতে উন্নীত করা হয়েছে যেখানে প্রায় ১১০০ আইসিইউ শয্যা ছাড়াও প্রায় ১২৫০০ সাধারণ শয্যা রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, অতি সম্প্রতি ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে যা করোনা মোকাবিলা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে।

ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ

ত্রাণ কাজে যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি কিংবা অব্যবস্থাপনা না থাকে এবং দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষক কেউ যেন অভুক্ত না থাকে সেজন্য তালিকা করে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা প্রদান করেছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে বিগত এবং বর্তমান ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৪ জন জেলা প্রশাসক, ৩২৮টি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে নগদ অর্থ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য জিআর নগদ অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়। শিশুখাদ্য ক্রয়ের জন্যও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। করোনা বিপর্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নন এমপিও কারিগরি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী, মাদ্রাসা এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরাও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসার এতিম ও দুস্থদেরও অনুদান বাবদ টাকা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মহীন অসচ্ছল শিল্পীসহ অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীদেরও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মোকাবিলায় ২ মে সাড়ে ৩৬ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অসচ্ছলদের সরাসরি অর্থ সহযোগিতা আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ ছাড়া কেউ ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে ত্রাণ সহায়তা পেয়ে যাবে। অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে ইতোমধ্যেই ৪৮০০ জন ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাঁচ কোটি টাকা প্রদান করেছেন। এ ছাড়া ভূমিহীন এবং গৃহহীনদের ঘর নির্মাণের জন্য জমি ক্রয় বাবদ আশ্রয়ণ প্রকল্পে দিয়েছেন পাঁচ কোটি টাকা।

কৃষি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহন নিশ্চিতকরণ

কৃষি কার্যক্রমকে বেগবান রাখতে এবং উৎপাদনের উপযোগী এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে প্রতিনিয়তই এই নির্দেশনা প্রদান করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। করোনা পরিস্থিতিতে যারা ধান কাটতে যাবে তাদের যাতে চলাচলে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ধান কর্তনের জন্য যাওয়ার ব্যাপারে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা প্রদান করেন। এ বছর রবি মৌসুমে বোরো ফসল দ্রুততম সময়ে কর্তনের জন্য হাওর অঞ্চলসহ সারাদেশে প্রায় ১৮০০-এর অধিক কম্বাইন হারভেস্টার, ৭০০টি রিপার এবং ২১৫টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার কৃষকদের মাঝে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ এবং কৃষকদের কষ্ট লাঘবের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ছাড়া প্রায় ৬২ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে ৪১৩.৫৬ কোটি টাকা প্রদানসহ বিএডিসির মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে ৮১,২৫৯ টন ধানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ

কভিড মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যে তিনি ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজে এক লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এসব প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পাচ্ছে প্রধানত ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টর, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহহীনদের গৃহনির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী বিচক্ষণতার আর একটি বিশেষত্ব হলো, বিভিন্ন উপকারভোগীর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বিশেষ করে সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে যাওয়া শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি। ভাসমান মানুষ, প্রতিবন্ধী, বিধবা নারী, ঘাট শ্রমিকসহ সব দুস্থ মানুষকে মানবিক সহায়তা প্রদান করার কার্যক্রম গ্রহণ হয়েছে।

করোনাকালে সার্বিক অর্থনীতি

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক সমীক্ষায় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি আগামী দুই বছরের জন্য ব্যবসার ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত হওয়ায় এককভাবে একটা দেশের আলাদাভাবে উন্নতি করা প্রায় অসম্ভব। করোনাকালেই দেশে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৪৫.১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে যা দিয়ে আগামী ১২ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। এ ছাড়া এপ্রিল ২০২১ মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় গত বছরের এপ্রিলে তুলনায় বেড়েছে ৫০৩ শতাংশ অর্থাৎ, গত বছর একই সময়ে রপ্তানি আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫২ কোটি ডলার, এ বছর এপ্রিল মাসে তা ৩১৩ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ১৩ অক্টোবর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী এ বছর পৃথিবীর সর্বোচ্চ জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা তিনটি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সূত্রানুযায়ী করোনার প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও গত অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪% হারে এবং আশা করা যাচ্ছে এ বছর তা ৬.১%-এ উন্নীত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্ব এবং সুদূর পরিকল্পনার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রশংসা

করোনার মহামারি থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন ২২ এপ্রিল ২০২০ প্রকাশিত লিডারশিপ স্ট্র্যাটেজি শিরোনামে তার লেখায় করোনা মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কতিপয় বিশ্বনেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করে। কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড কিউসি এ বছর বিশ্ব নারী দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বের শীর্ষ তিনজন অনুপ্রেরণা প্রদানকারী নারীনেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এশীয় ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তার করোনা ব্যবস্থাপনা ও ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং এ খাতে ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধনম গেব্রিয়েসুস ৪ মে কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গৃহীত কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। করোনা মহামারি মোকাবিলা এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত সব কার্যক্রম এই ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, করোনা মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাই শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে আমাদের প্রশংসা করা উচিত।

করোনাকালেও স্বপ্টেম্নর পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রকল্পসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো কাজ থেমে থাকেনি। কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মনোবল ও বিচক্ষণতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় এগিয়ে গেছেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনা সংকট কাটিয়ে অদম্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।

সাবেক সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়; চেয়ারম্যান, বিমান পরিচালনা পর্ষদ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

মন্তব্য করুন