২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুম্বাইয়ের ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র 'ডার্টি পিকচার'। দক্ষিণ ভারতের এক সময়ের সাড়া জাগানো অভিনেত্রী সিল্ক্ক স্মিথের জীবন কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত। ছবিতে মূল চরিত্রে অর্থাৎ সিল্ক্কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান। এছাড়া অভিনয় করেছেন মুম্বাই ফিল্মের শীর্ষস্থানীয় অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহ ও ইমরান হাশমী। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন একজন অভিনেত্রীর কী করুণ পরিণতি ডেকে এনেছিল, তা অত্যন্ত সুচারুরূপে ছবিটিতে তুলে ধরা হয়েছিল। বিদ্যা বালান সিল্ক্ক চরিত্রটি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, দর্শকরা কখনও আবেগে উৎফুল্ল হয়েছেন, কখনও সিটি বাজিয়েছেন, আবার শেষ দিকে এসে ভারাক্রান্ত হয়েছেন। মূল কাহিনি হলো, ছোটবেলা থেকে সিনেমার ভক্ত গ্রাম্যমেয়ে রেশমা একদিন শহরে চলে আসে নায়িকা হওয়ার আশায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সে এক সময় জায়গা করে নেয় মুম্বাই ফিল্মপাড়ায়। রঙিন জগতে তার নতুন নাম হয় সিল্ক্ক। নানা কায়দায় সে সিনেমা জগতের উঁচু স্থানে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। এক সময় সে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন শুরু করে। আরও ওপরে ওঠার নেশায় বুঁদ হয়ে সে তার সবকিছু বিলিয়ে দেয় জনে জনে। এক পর্যায়ে সে প্রচুর দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে তার ক্যারিয়ারেও নামে ধস। অর্থের জন্য সে পা বাড়ায় অশ্নীল অভিনয়ের দিকে। কিন্তু সেখানেও সে ব্যর্থ হয়। আকণ্ঠ দেনায় নিমজ্জিত সিল্ক্ক শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মাধ্যমে মুক্তি খুঁজে নেয়।

পৃথিবীটা বড়ই বিচিত্র জায়গা। এখানে আজ যে সাফল্যের শিখরে, কাল সে নেমে আসে একেবারে ভূতলে। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির আচার-আচরণ, মনোবৃত্তি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে, হঠাৎ সাফল্যের শীর্ষে অরোহণকারীদের অনেকেই পপাত ধরণিতল হয়েছে মূলত পদস্খলনের কারণে। সাময়িক সাফল্যকে স্থায়ী মনে করে তারা একধরনের ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। আর তার ফলে শুরু করে বেপরোয়া জীবনযাপন। এর অনিবার্য পরিণতি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম এবং অনভিপ্রেত পরিণতি।

গত কয়েক দিন ধরে ঢাকাই সিনিমার নায়িকা পরীমণিকে নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিত্যনতুন খবর বেরোচ্ছে। গত ৮ জুন রাতে বনানীর বাসা থেকে দু-তিনজন সঙ্গীসহ আশুলিয়ার বিরুলিয়ার 'ঢাকা বোট ক্লাবে' যান। অপ্রীতিকর ঘটনা, এর জের ধরে চার দিন পরে গুলশান থানায় তার অভিযোগ এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে একজন রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীর গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড এখন দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া এখন সরগরম।

নায়িকা পরীমণিকে নিয়ে সৃষ্ট ঘটনার পর কয়েকটি প্রশ্ন উঠেছে। এক. একজন নায়িকা সদস্য না হয়েও অভিজাত ক্লাবগুলোতে যাবেন কিনা। দুই. যে কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে তার গায়ে হাত তোলার কোনো অধিকার কারও আছে কিনা। গ্রেপ্তার ব্যবসায়ী পরীমণিকে চড় মারার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে বলে সংবাদ বেরিয়েছে। 'ক্লাব কালচার' বিষয়ে গত ১৭ জুন সমকাল 'আড়ালেই থেকে যায় ক্লাবপাড়ার অঘটন' শিরোনামে যে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওইসব ক্লাবে মাঝেমধ্যেই সদস্য বা আগত গেস্টদের মধ্যে নানারকম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকে। কালেভদ্রে দু-একটি ছাড়া সব ঘটনাই পর্দার আড়ালে থেকে যায়। ক্লাবগুলো নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার্থেই অভ্যন্তরীণভাবে বিবাদগুলো মিটিয়ে ফেলে, বাইরে আসতে দেয় না। যেহেতু এসব ক্লাবের

কর্মকর্তা-সদস্যরা সমাজের বিত্তবান ও অভিজাত শ্রেণির, তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোচরে এলেও এসব নিয়ে তারা সময় নষ্ট করেন না। এদিকে, ক্লাবপাড়ার ঘটনা স্থান পেয়েছে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের আলোচনায়ও। গত ১৭ জুন সংসদ অধিবেশনে কয়েকজন সদস্য ক্লাবগুলোর বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন।

অভিজাত ক্লাব ছাড়াও রাজধানীতে কিছু অননুমোদিত ক্লাব রয়েছে। সেখানে বিরোধ বা বিতর্ক অনেকদূর গড়াতে পারে। এমন একটি ঘটনায় বনানীর আবেদীন টাওয়ারে 'ট্রাম্পস ক্লাবে' ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ঢাকাই চলচ্চিত্রের নায়ক সোহেল চৌধুরী। ওই ক্লাবটি কোনোরকম সরকারি অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। নায়ক সোহেল চৌধুরীর হত্যাকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখনও রাজধানীতে ওই ধরনের কিছু ক্লাব রয়েছে বলে শোনা যায়। হয়তো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সেসব জানে। তবে, বিশেষ কারণে তারা কখনও কালা, কখনও দৃষ্টিহীন, কখনও চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ে। যেমন নাকের ডগায় ঘটলেও মতিঝিলের ক্রীড়াক্লাব পাড়ায় জমজমাট ক্যাসিনো ব্যবসা তাদের নজরে আসেনি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা আসার পরই তারা সচল হয়েছিলেন।

আবার গোড়ার কথায় ফিরে যাই। একজন নাগরিক হিসেবে ক্লাবে যাওয়ার অধিকার পরীমণির রয়েছে। তবে তা অবশ্যই সংশ্নিষ্ট ক্লাবের নিয়মনীতি ও রাষ্ট্রীয় আইন মেনে। সাধারণত এসব ক্লাব রাত ১২টার পরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরীমণি যে দুটি ক্লাবে গিয়ে ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, সে দুটিতেই তিনি গিয়েছিলেন নির্ধারিত সময়ের পর। তিনি যদি ক্লাবের নিয়ম মেনে সেখানে যেতেন, তাহলে হয়তো এ ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম হতো না, এত প্রশ্ন উঠত না। একটি বিষয় বেদনাদায়ক হলেও সত্যি যে, আমাদের সিনেমা এবং নাট্যজগতের কতিপয় অভিনেত্রী সম্পর্কে নানা ধরনের কথাবার্তা প্রায়ই মিডিয়ায় আসে। সেসব নিয়ে সমাজের কেউই খুব একটা মাথা ঘামান না।

আমরা যারা দেশীয় চলচ্চিত্রের দর্শক, তারা আমাদের নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে একসময় গর্ব করতাম। তাদের অভিনয়শৈলী আমাদের মুগ্ধ করত। আমাদের মনোযোগ থাকত শুধু তাদের অভিনয়ের দিকে, ব্যক্তিজীবনের দিকে নয়। তারাও ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যক্তিগতই রাখতেন, পাবলিক করতেন না। কারও কারও জীবনে কিছু ভিন্নরকম ঘটনা যে ছিল না তা নয়। তবে তা কখনোই সাধারণ মানুষের গোচরীভূত হতো না। অবশ্য সিনে পত্রিকাগুলো কোনো কোনো নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে মুখরোচক গল্প ছাপত। সেসব গল্প কার সঙ্গে কার অন্তরঙ্গতা হলো বা ভেঙে গেল তার মধ্যেই সীমিত ছিল। কত স্বনামধন্য অভিনেত্রী ছিলেন আমাদের! বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কথা উঠলেই তাদের নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। কিন্তু আজকাল এমন কতিপয় অভিনেত্রীর কথা শোনা যায়, যারা পেশায় এসেই বিত্তবৈভব অর্জনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। আর এ নেশা তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে। যেমন পেশাজীবনে, তেমনি ব্যক্তিজীবনেও।

রচনার শুরুতেই মুম্বাই ছবি ডার্টি পিকচারের প্রসঙ্গ টেনেছিলাম। আমার পর্যবেক্ষণে ওটা শুধু একটি সিনেমা ছিল না, ছিল একটি মেসেজ। বিলাসী জীবনের আশায় পেশাদারিত্বকে বিসর্জন দিয়ে অর্থের জন্য উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলা কী করুণ পরিণতি বয়ে আনতে পারে, সে মেসেজই দেওয়া হয়েছে ছবিটিতে। কিন্তু তা কি সবার বোধোদয় ঘটাতে পেরেছে? এই বার্তা যেমন পরীমণির মতো অভিনেত্রীর জন্য, তেমনি নাসির উদ্দিন মাহমুদের মতো ব্যবসায়ীর জন্যও।

সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক

বিষয় : সমকালীন প্রসঙ্গ মহিউদ্দিন খান মোহন

মন্তব্য করুন