একদিনের পত্রিকায় নারী নির্যাতন-নিপীড়নের ছয়টি খবর। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না, সব খবরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। খবরের আড়ালেও খবর থেকে যায়। ৫ জুলাই সমকালে নারী নির্যাতন-নিপীড়নের যে খবরগুলো উঠে এসেছে- এমন খবর প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয় আর আমাদের প্রশ্ন বাড়তেই থাকে। নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চিত্র সভ্যতা-মানবতার কলঙ্ক, এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। শুধু নারীই নয়, সমান্তরালে চলছে শিশু নির্যাতনও, বিশেষ করে কন্যাশিশু।
সম্প্রতি নারী পাচারের সূত্র ধরে কিশোর গ্যাংয়ের অপকাণ্ডের যে সন্ধান মিলেছে, তা বিস্ময়কর। ইভটিজিং কিংবা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ভয়াবহ কদর্য ঘটনাগুলোর রাশ টানা গেলেও করোনাকালে এমন ঘটনা ফের বাড়ছে। সম্প্রতি এ রকম ঘটনা আরও ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, টিকটকের ফাঁদে পড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হওয়া তরুণীরা দেশে ফিরে তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছে, তা ভয়াবহ। এই সূত্র ধরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুস্কর্মের হোতা অনেককে গ্রেপ্তার করে। তারা সন্ধান পেয়েছে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছে দেশি-বিদেশি কয়েকশ সদস্য। জানা গেছে, শুধু ভারতেই নয়; এই চক্র মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও দীর্ঘদিন ধরে নারী পাচার করে আসছে। আমরা দেখছি, গণপরিবহন নারীর জন্য আরেকটি ভয়াবহ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দেশের গণপরিবহনে নারীরা নানাভাবে যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হতে থাকলেও এর প্রতিকারচিত্র ব্যাধি দূরের জন্য কতটা আশাব্যঞ্জক, এও নয় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। নারী-শিশু নির্যাতন-নিপীড়ন প্রতিরোধে আমাদের যে আইন রয়েছে, তা অত্যন্ত কঠোর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধর্ষণ প্রতিরোধেও প্রণীত হয়েছে কঠোর আইন। কিন্তু তারপরও নারীর অধিকার-মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছেই। গণপরিবহনে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ইতোমধ্যে কম ঘটেনি।
চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এক নারী পোশাককর্মী কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এমন বীভৎসতার শিকার হন। একজন সমাজবিরোধী, দুর্বৃত্ত তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে এতটাই ক্ষমতাবলয় গড়ে তোলে যে, বাসের অন্য যাত্রীদের নামিয়ে শুধু ওই পোশাককর্মীকে নিয়ে তাদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট গন্তব্যে যায় এবং জীবনের ওপর হামলে পড়ে। আমাদের সামাজে নারী এখনও কতটা নিরাপত্তাহীন এটি একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। দেশের গণপরিবহনে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে। এক সমীক্ষায় প্রকাশ, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গণপরিবহনে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৩৫টি। সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, এর মধ্যে ধর্ষণের পর ১৩ শতাংশ নারীকে হত্যা করা হয়। আমরা গণপরিবহন বিশেষ করে বাসে নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো থেকে খুব সহজেই আঁচ করতে পারি, একজন কর্মজীবী নারীর জন্য তার যাতায়াতের পথ কী ভয়াবহ বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে! আমরা সঙ্গতই প্রত্যাশা করেছিলাম, ধর্ষণের প্রতিকারে প্রণীত আইনটির আলো সমাজে প্রতিভাত হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মামলা নিষ্পত্তির গতি অত্যন্ত মন্থর। আবার মামলা গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অনেকেরই রয়েছে নানারকম গাফিলতি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা।


আমরা জানি, বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার মূলে কুঠারাঘাত করে। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজের নতুন কোনো বিষয় নয়। এই পরিস্থিতি থেকে আমরা কিছুটা বের হয়ে আসতে পারলেও এর নিরসন ঘটানো যাচ্ছে না বলেই অন্ধকার জিইয়ে আছে। ৫ জুলাই বরগুনার কলেজ রোডে মায়ের কাছে চিঠি লিখে কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনাটিও প্রমাণ করে, জননিরাপত্তা বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা ও লাঞ্ছনা-নিগ্রহের প্রতিকারে প্রণীত আমাদের আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে। বরগুনার ওই কিশোরী উত্ত্যক্তকারীর যন্ত্রণা সইতে না পেরে বেছে নেয় আত্মহনের পথ। বরিশালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার এক নারী আসামি জিজ্ঞাসাদের সময় পুলিশের যৌন নির্যাতনের শিকার হন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ৪ জুলাই বরিশালের উজিরপুর থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হলেও প্রায় ২৪ ঘণ্টা তা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। এই ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় দিনাজপুরের ইয়াসমিনের কথা। পুলিশের ভ্যানে 'নিরাপদ হেফাজতে' ইয়াসমিনকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন ওই পুলিশ সদস্যরা। মনে পড়ে চট্টগ্রামের সীমার কথাও। পুলিশ সদস্য কর্তৃক ধর্ষিত হয়ে তাকে থাকতে হয়েছিল এই 'নিরাপদ হেফাজতে', যেখানে তার নিরাপত্তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন। নিরাপদ হেফাজতের নামে যেখানে বন্দি নারীরা দিনযাপন করেন, তা কতটা অনিরাপদ এরই সাক্ষ্য বহন করে উল্লিখিত ঘটনাগুলো।
স্বীকার করতে হবে- পুলিশে অনেক মানবিক, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-সদস্য রয়েছেন। তারা সমাজে নানারকম কল্যাণমূলক কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন পেশাগত দায়িত্বে থেকেই। করোনাকালেও পুলিশের অনেক সদস্যের নানারকম মানবিক উদ্যোগ আমাদের অভিভূত করেছে। কিন্তু তাদেরই কারও কারও দুস্কর্মের খতিয়ানও দীর্ঘ হয়ে চলেছে। বরিশালের ঘটনাটি এরই আরও একটি দৃষ্টান্ত। এখানেই আসে সংস্কৃতির প্রশ্ন। পুলিশের বিরুদ্ধে নেতিবাচকতার অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তকে ক্লোজ করা হয়- এই প্রক্রিয়া দেখে আসছি দীর্ঘদিন থেকে। আমি মনে করি, আমাদের দায়িত্বশীল কোনো কোনো মহলের কিছু নথি বা বিধান আমাদের সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা মোটেও সাংস্কৃতিক সুস্থতার চিহ্ন নির্দেশ করে না। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের দিক থেকে যতটা সংগ্রামী, সাংস্কৃতিক নান্দনিক বোধের দিক থেকে ততটা পরিশীলিত নই। গুলির মুখে আমরা নির্বিবাদে দাঁড়িয়ে যেতে পারি কিন্তু অনেকেরই কাঁচা, অপরিশীলিত সাংস্কৃতিক চেতনার কারণে পিছিয়েও পড়ি। এই সত্যও অস্বীকার করা যাবে না, আইন অপরাধীকে শাস্তি দিলেও রাতারাতি মানবিক করতে পারে না। তবে দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তির নজির সমাজে থাকলে অপরাধীর চৈতন্যবোধ জাগ্রত হবে, তা আশা করা যায়।
নারী পাচার, ইভটিজিং, ধর্ষণ এই গুরুতর অপরাধগুলোর ক্রমবৃদ্ধি এও সাক্ষ্য দিচ্ছে- ক্ষয়ের ভাগ বেশি, নির্মাণের অংশ ধীর। আমাদের সংস্কৃতিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বিদেশি সংস্কৃতির অনেক কিছু যা আমাদের সংস্কৃতির বিপরীত, সেসব সুস্থ সংস্কৃতির আল ভেঙে দিচ্ছে। অবক্ষয়ের তোড়ে ভেসে যেতে চাইছে মানবিকতার হাজার রকম বোধ। নির্যাতন-নিপীড়নের অহরহ ঘটে চলা ঘটনাগুলো এও বলে দেয়, আমাদের সংস্কৃতি অপরাজনীতির কাছে পরাজিত হচ্ছে, পিছু হটছে তার চিরকালীন মূল্যবোধ। আমরা সংবাদমাধ্যমেই দেখি, অপরাধীর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষমতাবান রাজনীতিকের কত সখ্য! কীভাবে তাদের কারও কারও ছায়াতল অপরাধীর 'নিরাপদ' আশ্রয়স্থল হয়! আমরা নুসরাতের ক্ষেত্রে স্পষ্টতই এমনটি দেখেছি। দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে। বেঁচে থাকার পথ নিস্কণ্টক হবে, দূর হবে লিঙ্গবৈষম্য, নারী-পুরুষের একসঙ্গে নিরাপদ অবস্থান সবক্ষেত্রে মানবিক শ্রেয়বোধের আলোয় হবে আলোকিত- এই প্রত্যাশাগুলো কবে পূর্ণাঙ্গতা পাবে? সময়ের অপেক্ষা। সেই সময় তৈরি করতে হবে আমাদেরই। সবার যূথবদ্ধ প্রয়াসেই নিস্কণ্টক করতে হবে মানুষের জীবনযাপনের সব পথ। তবেই মুক্ত হবে জীবন রাহুগ্রাসের থাবা থেকে।
কথাসাহিত্যিক