বাংলাদেশে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে মানুষ। কঠিন পরিশ্রমী কৃষক, কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার পাঠানো প্রবাসী। একটানা আট থেকে ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রের মতো কারখানার চাকা ঘুরিয়ে চলা, সময়মতো বেতন না পাওয়া, কথায় কথায় বেতন কাটা আর ক্ষণে ক্ষণে কারখানার আগুনে পুড়ে মরা শ্রমিক। প্যাডেল ঘোরানো রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, সবজি বিক্রেতা, বাস-টেম্পোর ড্রাইভার-কন্ডাক্টর; কাঠের আসবাব বানানোর, তালা সারানোর, দা-বঁটি শান দেওয়ার কারিগর, রাজমিস্ত্রি, পানির কল সারানোর মানুষ, রংমিস্ত্রি, ইজিবাইকের তরুণ চালক- এরাই বাংলাদেশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা দেশের মোট কর্মক্ষম মানুষের ৭৬ শতাংশ। বাকি মাত্র ১৪ শতাংশ কাজ করে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। করোনাকালে এরা সবাই কষ্টে আছে। বেশিরভাগ তিনবেলা খেতে পাচ্ছে না; ঋণে জর্জরিত হয়ে গেছে। কবে, কীভাবে শোধ হবে ঋণ- জানা নেই।
করোনার ভয়াবহতা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব অনুধাবন করে প্রথম করোনা শনাক্তের মাত্র ১১ দিন পর প্রধানমন্ত্রী কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত সচল রাখতে বিভিন্ন রকম আর্থিক এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা করেন। সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কয়েক ধাপে ঘোষিত এসব প্রণোদনার আর্থিক মূল্য এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৩৩ শতাংশ। করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের আর্থিক এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের বিস্তারিত দেখে সবাই আশ্বস্ত হতে পারেনি।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বিগত অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫% বা ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনার কারণে রপ্তানি কিছু কম হলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের বাড়তি রপ্তানি তা ভালো করে পুষিয়ে দিয়েছে। সহজ কথায়, করোনাকালে রপ্তানিমুখী শিল্প কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। অথচ প্রায় ৬২ শতাংশ প্রণোদনা গেছে শুধু রপ্তানি খাতে। রপ্তানিকারকরা রপ্তানি করে লাভ করেছে, সরকারের প্রণোদনা থেকেও লাভ করেছে।
শুধু রপ্তানিকারকরা নন, করোনাকালে ব্যাংকগুলোও লাভ করেছে আগের থেকে বেশি। তাদের বাড়তি লাভ এসেছে করোনার অজুহাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নামমাত্র সুদে ঋণ নিয়ে তা বেসরকারি খাতে লগ্নি করে; সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় সবটুকু বাস্তবায়নে দায়িত্ব পেয়ে; সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে অতীতের চেয়ে ১৫% রপ্তানি বেশি হওয়ায় সংশ্নিষ্ট আমদানি এবং অন্যান্য সংশ্নিষ্ট লেনদেন থেকে, সরকারের অবকাঠামো নির্মাণকাজ থেকে, অতিরিক্ত রেমিট্যান্সের টাকা লেনদেন করে, করোনার অজুহাতে কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে এবং ছাঁটাই করে ইত্যাদি। রপ্তানিকারক এবং ব্যাংক ছাড়া অন্যান্য বৃহৎ ব্যবসা করোনাকালে তেমন মুনাফা করতে পারেনি। এ সময়ে তাদের গড়ে ৩০ শতাংশের মতো বিক্রয় কম হয়েছে।
সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের শতভাগ সুবিধা নিয়েছে বৃহৎ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। কার্যকর অযোগ্য শর্তাবলি এবং প্রশাসনের ব্যর্থতায় ঠিকভাবে কার্যকর হয়নি ক্ষুদ্র শিল্প, ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঘোষিত প্রণোদনাগুলো। বাড়ছে দারিদ্র্য; অর্থনৈতিক বৈষম্য। করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে বা আয় কমে দরিদ্র হয়েছে প্রায় তিন কোটি মানুষ। আরও তিন কোটি দরিদ্র এবং হতদরিদ্র করোনার আগে থেকেই ছিল। নতুন দরিদ্রদের মধ্যে ১.৩৫ কোটি মানুষ করোনার কারণে কাজ হারিয়েছে; বাকিদের আয় কমেছে।
করোনা ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে ধনী তোষণ নীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য দেওয়া অপ্রতুল প্রণোদনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় ধনীদের হাতে আরও বেশি ধন পৌঁছানো হয়েছে; দরিদ্র অনেক বেশি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। করোনার আগে যেখানে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ এখন তা প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। ছোট-বড় সব ব্যবসায়ের উৎপাদন, সেবা, বিক্রয়, আয় কমে গেছে। কমে গেছে কর্মসংস্থান। নগদ অর্থের অভাবে অনেক মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। মুখ বুজে সহ্য করছে মধ্যবিত্ত। ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে দরিদ্র রেখে কোনো সমাজ উন্নত হতে পারে না। দারিদ্র্য আরও দারিদ্র্য ডেকে আনে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র বলে অর্থনীতিতে একটা কথা আছে। করোনাভাইরাস আমাদের সে চক্রে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটাতে হলে নিম্ন আয়ের মানুষদের হাতে টাকা পৌঁছাতে হবে। দরিদ্র এবং কর্মহীন মানুষদের হাতে প্রতি মাসে কমপক্ষে পরিবারপ্রতি ৫,০০০ টাকা পৌঁছাতে হবে এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ জনসেবার সঙ্গে সরাসরি সংশ্নিষ্ট খাতে বেশি বেশি করে খরচ করা দরকার। সরকারের খরচের এক অংশ পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যায়, আরেক অংশ শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায়। মান ও সময় নিয়ন্ত্রণ করে সরকারের খরচ বাড়াতে পারলে একদিকে নিম্ন আয়ের মানুষদের অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘুচবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনীতি চালু থাকবে।
অর্থনীতি চালু না থাকলে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার চাহিদা থাকবে না। চাহিদা না থাকলে ধনী মানুষের কলকারখানা অচল হয়ে যাবে, কর্মীদের কাজ থাকবে না, মানুষের আয় থাকবে না, সরকার ট্যাক্স পাবে না। কাজ না থাকলে আমরা আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ব। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে ধনী তোষণ নীতি ত্যাগ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পক্ষে কল্যাণকর এবং প্রয়োগযোগ্য নীতি নিয়ে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারাই করের শেষ বোঝা বহন করে, তারাই ক্রেতা, তারাই বাজার। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে কোনো অর্থনীতিই টেকসই হতে পারে না।
হচার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট ও কলাম লেখক