বিদেশ পাড়ি দিলেই অনেক বেতনে চাকরি, উন্নত জীবন- নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয় নিরীহ মানুষকে। বিদেশে আটকে রেখে চালানো হয় নির্যাতন। সেই নির্যাতনের অডিও-ভিডিও দেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। শুধু এই নয়; মানব পাচারকারীদের সহায়তায় বিদেশে বাংলাদেশিরা অপহরণেরও শিকার হচ্ছে। গত বছর মে মাসে লিবিয়ার মিজদা শহরে বন্দি শিবিরে গুলি করে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যান ১২ জন। হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ২৫টি মামলা করে তাদের পরিবার। এ পর্যন্ত ২৩টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে আদালতে। এসব চার্জশিটে মোট আসামি ২৮৮ জন। এর মধ্যে ১৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতকদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ দিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান সমকালকে বলেন, লিবিয়ায় মানব পাচার ও হত্যাকাণ্ডে ২৫টি মামলার মধ্যে একটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। একটি মামলা তদন্তাধীন। খুব শিগগির এটিরও চার্জশিট দেওয়া হবে।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে লিবিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো বন্ধ। লিবিয়ায় করুণ পরিণতির শিকার কাউকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে নিয়ে এবং পরে দুবাই-মিসর হয়ে সে দেশে পাঠানো হয়েছিল। কাউকে ঢাকা থেকে দুবাই, এর পর মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গত বছর মার্চ পর্যন্ত তাদের লিবিয়ায় পাচার করা হয়েছিল। সেখানে নেওয়ার পর ক্যাম্পে আটকে রেখে মাসিক ভিত্তিতে টাকা আদায় করেছে পাচার চক্রের সদস্যরা।

সেদিন যা ঘটেছিল: পাচারের শিকার ৯ জন দেশে ফিরে সে বন্দিশালার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে আহত জানু মিয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি জানান, শ্যামল ও সোহাগ নামে দুই দালাল আশ্বাস দেয়, লিবিয়ায় ৪০ হাজার টাকা বেতনে তাকে চাকরি দেওয়া হবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর মতিঝিল নিয়ে আসা হয় তাকে। তারপর বাসে যান বেনাপোল। সেখান থেকে তাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা। কলকাতা থেকে বিমানে নিয়ে যাওয়া হয় মুম্বাই। সেখান থেকে নিয়ে দুবাই। এর পর মিসর হয়ে লিবিয়া। মিসরে যেখানে তাকে রাখা হয় সেখানে আরও ১০০ বাংলাদেশি ছিল। মিসর থেকে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজিতে। সেখানে শ্যামল ও সোহাগের সহযোগী রাহাত তাদের আটকে রেখে টাকা দাবি করে। খাবার দেওয়া হতো না। পরে বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রাহাতের দেশীয় সহযোগীদের টাকা দেওয়া হয়। বেনগাজি থেকে অন্য এক দালালের কাছে তাদের হস্তান্তর করে রাহাত। জানুয়ারিতে লিবিয়ায় ১৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ দেওয়া হয়। পরে বেশি বেতনে ইতালিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয় তাদের। ২০২০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি ১০ জনকে একটি গাড়িতে নিয়ে ত্রিপলি যাওয়ার জন্য রওনা দেয় পাচারকারীরা। আরও দুটি গাড়িতে বাংলাদেশিদের নেওয়া হচ্ছিল ত্রিপলিতে। মাঝপথ থেকে অপহরণ করা হয় তাদের। মিজদা শহরে প্রায় ১৫ দিন আটকে রেখে অপহরণকারীরা মুক্তিপণের জন্য তাদের ওপর নির্যাতন চালায়। এমনকি প্রতিদিন কাউকে না কাউকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ দেখানো হতো। জানানো হতো, টাকা না দিলে তাদেরও প্রাণ হারাতে হবে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ঘানা ও নাইজেরিয়ার কয়েকজন মিলে অপহরণ চক্রের এক মাফিয়াকে হত্যা করে। এতে ক্ষুব্ধ হয় চক্রের অন্য সদস্যরা। তারা অপহৃত দের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

যাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল: লিবিয়ার মিজদা শহরে অপহরণকারীদের গুলিতে নিহত ২৬ জনের মধ্যে ছিলেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বিদ্যানন্দীর জুয়েল, মানিক; একই জেলার টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা, জুয়েল, মনির; রাজৈরের ইশবপুরের মনির, সজীব; মাদারীপুরের ফিরোজ, শামীম, জাকির হোসেন; কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের রহিম, ভৈরবের রাজন, শাকিল, আকাশ, সোহাগ, মো. আলী; গোপালগঞ্জের সুজন, কামরুল; যশোরের রাকিবুল, মাগুরার মোহাম্মদপুরের লাল চান্দ ও ঢাকার আরফান। নিহতদের লিবিয়াতেই দাফন করা হয়। আহত ১২ জনের মধ্যে ৯ জন গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।

মামলা ও চার্জশিট: লিবিয়ার ঘটনায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় প্রথম মামলা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, বনানী, তেজগাঁও, খিলগাঁও, মাদারীপুর সদর ও রাজৈর থানা, যশোরের ঝিকরগাছা, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা, হবিগঞ্জের বানিয়াচং, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, মাগুরার মহম্মদপুর এবং ফরিদপুরের সালথা থানায় আরও ২৪টি মামলা করে ভুক্তভোগীদের পরিবার। এসব মামলার মধ্যে ১৪টির তদন্ত করেন মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ১৩টির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ১১টি মামলার তদন্ত করে সংশ্নিষ্ট জেলা সিআইডি। ১১টির মধ্যে ১০টি মামলার চার্জশিট এবং যশোরের ঝিকরগাছা থানার মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে আদালতে। সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে একটি মামলা তদন্তাধীন। ২৩টি চার্জশিটে মোট আসামি ২৮৮ জন। চার্জশিট জমা দেওয়া পর্যন্ত ২৩টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৫৩ জনকে। তবে কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিক চার্জশিটেও অভিযুক্ত। সে হিসাবে এসব চার্জশিটে অভিযুক্ত ১৩৫ জন এবং একই ব্যক্তি একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে, যে কারণে ২৩ মামলায় গ্রেপ্তার সংখ্যা ১৫৩। চার্জশিটে চারটি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং একটি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আসামি হয়েছে।

২০২০ সালের ৫ জুন পল্টন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে করা একটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় গত মে মাসে। চার্জশিটে বলা হয়েছে- ৩৯ বাংলাদেশিকে লিবিয়ার বেনগাজিতে রাখা হয়। সেখানে তারা মানবেতর জীবন যাপন করায় অপহরণ চক্রের সদস্যরা তাদের ইতালি যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। আসামিরা ২০২০ সালের ১৬ মে ৩০ জনকে তিনটি মাইক্রোবাসে তুলে ত্রিপলিতে তাদের লোকজনের কাছে পাঠায়। এক পর্যায়ে মরুভূমির পাকা সড়কে এক দল লিবীয় সন্ত্রাসী মাইক্রোবাসের সামনে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে ২৯ জনকে অপহরণ করে একটি পিকআপে ঠাসাঠাসি করে ওঠানো হয়। একজন মাইক্রোবাসের সিটের নিচে আত্মগোপনে ছিলেন। ২৯ জনকে নিয়ে মরুভূমির মধ্যে পরিত্যক্ত এক তলা ভবনে আটক রাখা হয় তিন দিন। ১৯ মে সন্ত্রাসীরা অপহৃত দের মিজদায় মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরদিন মাফিয়ারা ২৯ বাংলাদেশিকে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে আরও ৯ বাংলাদেশি এবং প্রায় ১৫০ আফ্রিকান আগে থেকেই আটক ছিল। ৩৮ বাংলাদেশিসহ আফ্রিকানদের পাইপ ও শিকল দিয়ে মারধর শুরু করে সন্ত্রাসীরা। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক শট দিয়ে জনপ্রতি ১২ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করে নির্যাতনের ভিডিও করা হয়। সেই ভিডিও অপহৃত দের স্বজনদের কাছে পাঠায়। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে আফ্রিকানদের গুলি করে হত্যা করা হতো সবার সামনেই। ঘটনার দিন সকালে মাফিয়ারা বন্দিশালায় ঢুকে মুক্তিপণের জন্য আবার নির্যাতন চালায়। এক পর্যায়ে আফ্রিকানরা পিটিয়ে হত্যা করে এক মাফিয়া নেতাকে। পরে চক্রের সদস্যরা ট্যাংক ও গাড়ি নিয়ে বন্দিশালায় ঢুকে বৃষ্টির মতো গুলি চালায়।

এই চার্জশিটে ৩৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক বারেক করিম হাওলাদারের দেওয়া চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে- এয়ার অ্যারাবিয়া কর্তৃপক্ষ নিয়মবহির্ভূতভাবে চার ভুক্তভোগীকে ওয়ানওয়ে টিকিট দিয়ে ঢাকা থেকে শারজাহ পাঠাতে সহায়তা করেছে।

পল্টন থানার মামলার চার্জশিটে অন্যতম অভিযুক্ত নূরজাহান। তিনি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ছিলেন। মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার স্বামী আব্দুস সাত্তারও এ চার্জশিটে অভিযুক্ত। অভিযুক্ত অন্য ৩৭ জনের মধ্যে আছে- রুজভেল্ট ট্রাভেল এজেন্সির পরিচালক আকবর হোসেন, নুর হোসেন শেখ, রবিউল মিয়া, ইলিয়াছ মীর, জাফর মিয়া, মো. শাওন ওরফে জ্যোতি নূর শাওন, আ. রব মোড়ল, কামাল উদ্দিন ওরফে হাজি কামাল, শরীফ হোসেন, জুলহাস সরদার, রফিকুল ইসলাম ওরফে সেলিম, খালিদ চৌধুরী ও সানজিদা।