আবর্জনার স্তুপে সম্পদ খুঁজে বেড়ানোর গল্প

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

সাজ্জাদ হোসেন

নিজের সংগ্রহশালায় নেলসন মলিনা

জাদুঘরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুষ্প্রাপ্য শিল্পকর্ম কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুর এক সংগ্রহশালার ছবি। অর্থ খরচ করে মানুষ সেখানে যায় অজানাকে জানতে, অদেখা কোনো কিছু দেখতে।

যদি বলা হয়, জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে ভাগাড় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন বস্তু! ভাবছেন, ফেলে দেওয়া আবর্জনা জাদুঘরে ঠাঁই পাবে কেমন করে?

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ভাগাড়ের আবর্জনা দিয়েই নিউইয়র্কে ব্যক্তি উদ্যোগে একটি জাদুঘর গড়ে তুলেছেন 'আবর্জনা মানব' খ্যাত নেলসন মলিনা। ৬৫ বছর বয়সী মলিনা দীর্ঘ ৩৪ বছর নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষের স্যানিটেশন বিভাগে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। এই কাজকে পৃথিবীর সেরা চাকরি হিসেবে দেখেন তিনি- 'আমি আমার কাজকে খুব ভালোবাসি। আমি শুধু মানুষের আবর্জনার বস্তা ট্রাকে তুলে ভাগাড়ে নিয়ে ফেলে দিই না। আবর্জনার মধ্যে সম্পদ খুঁজে বেড়াই আমি।'

আবর্জনা থেকে খুঁজে বের করা ৫০ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন বস্তু দিয়ে সংগ্রহশালাটি সাজিয়েছেন মলিনা। ম্যানহাটনে গড়ে তোলা এই সংগ্রহশালাটির নাম দিয়েছেন 'সিক্রেট মিউজিয়াম'। তার আশা, খুব শিগগির নগর কর্তৃপক্ষ তার সংগ্রহশালাটিকে জাদুঘরের মর্যাদা দেবে।

মলিনার সংগ্রহশালাটি দেখলে মনে হবে প্রাচীন শিল্পকর্মের বিশাল প্রদর্শনী। এখানে আছে কাচের ফুলদানিতে ঠাসা টেবিল, স্বর্ণালঙ্কার, রুপার দীপাধার, কারুকাজ করা ঘড়ি, ইলেকট্রিক গিটার আর ভায়োলিন। মলিনা বলেন, 'আমার সংগ্রহশালায় ঠাঁই পাওয়া সবকিছুই এসেছে আবর্জনার স্তূপ থেকে। আমি যদি এসব সংগ্রহ না করতাম তাহলে মাটির সঙ্গে মিশে যেত।' শুধু ফেলনা বা স্বল্পমূল্যের বস্তু নয়, ভাগাড় থেকে কুড়ানো এসব বস্তুর মধ্যে আছে অনেক দামি জিনিসও। সংগ্রহশালায় আছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র স্টার ওয়ারসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া উপহারসামগ্রী, আমেরিকার তারকা খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফসমৃদ্ধ বেসবল। আছে টনি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী অভিনেত্রী বেত্তে মিদেলের অটোগ্রাফ দেওয়া বইসহ অনেক অমূল্য সম্পদ। ২০১৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ৬৪ বছরের মলিনা দীর্ঘ চাকরি জীবনের সুবাদে আবর্জনার ব্যাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী খুঁজে বের করার দারুণ দক্ষতা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, আমি আবর্জনার ব্যাগ হাতে নিয়েই বুঝতে পারি এর ভেতরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা মূল্যবান সামগ্রী আছে কিনা।

পূর্ব ম্যানহাটনে পরিচ্ছন্নতা বিভাগের গ্যারেজে গড়ে তোলা মলিনার এই আজব সংগ্রহশালা এখনও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, আমি চাই নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ পরিচ্ছন্নতা বিভাগের জন্য একটি সুন্দর ভবন দেবে। সেই ভবনের একটি অংশে আমার সংগ্রহ করা জিনিসপত্র নিয়ে জাদুঘর নির্মাণের পর সেটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। আমরা আসলে কতটা অপচয়কারী সবাই জাদুঘরটি ঘুরে দেখে অনুধাবন করুক।

আবর্জনার স্তূপ থেকে কুড়ানো জিনিস প্রথমে তিনি কর্মক্ষেত্রে নিজের লকারে সংগ্রহ করা শুরু করেন। সেটা ভর্তি হয়ে গেলে পুরুষ কর্মীদের ড্রেসিং রুমে রাখা শুরু করেন। সংগ্রহ করা জিনিসপত্রে পুরো কক্ষটিই পূর্ণ হয়ে যায়। এখন ভবনের পুরো একটি তলাই মলিনার সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে।

মলিনা বলেন, মানুষ অনেক অব্যবহূত জিনিসও ভাগাড়ে ফেলে দেয়। অনেকে হয়তো অনেক ভালোবেসে প্রিয়জনকে কোনো কিছু উপহার দেন। কিন্তু অনেক সময় উপহারের সেই প্যাকেট খুলেও দেখা হয় না। কিন্তু যে মানুষটি উপহার দেন তিনি হয়তো ভাবেন প্রিয়জন তার উপহারের জিনিস দেখে কিংবা ব্যবহার করে তার কথা স্মরণ করবে।