দুস্থদের জন্য যে কারণে জুতা সংগ্রহ করে ছেলেটি

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০১৯      

অনলাইন ডেস্ক

বছর তিনেক আগের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর অধিবাসী ১১ বছরের কাইলার নিপার তখন ছিক্স গ্রেডের ছাত্র ছিল। স্কুলে জীর্ণ জুতা পরার জন্য প্রায়ই তার সহপাঠীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো।

একদিন স্কুলে জীববিজ্ঞান ক্লাসে ঢোকার আগে কাইলারের কয়েকজন সহপাঠী আবারও তার মলিন জুতা নিয়ে উপহাস করতে শুরু করে। এর মধ্যে একজন হঠাৎ করে কাইলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কাঁধ ও বুকে পেন্সিলের ধারালো অংশ দিয়ে কয়েকবার আঘাত করে। এতে কাইলারের ফুসফুস ফুটো হয়ে যায়। 

ঘটনার পর পরই কাইলারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সে তিনদিন ভর্তি ছিল। কাইলারের মা জানান, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ছেলেটি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই ঘটনা কিছুতেই সে মন থেকে তাড়াতে পারছিল না। এ কারণে তিনি ও কাইলারের বাবা কাইলারকে বাড়িতে রেখেই স্কুল করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে থেকে কাইলার বাড়িতেই পড়াশোনা করেছে।

কাইলারকে যে ছেলেটি আঘাত করেছিল পরবর্তীতে তাকে স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়। সেই সঙ্গে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের শাস্তিও দেয়। 

কাইলারের মা জানান, জন্মগতভাবে তার ছেলের পায়ের সামনের অংশ মাটিকে স্পর্শ করতে পারে না। এ কারণে তার হাঁটাও স্বাভাবিক মনে হয় না। এটা নিয়েও তার সহপাঠীরা হাসাহাসি করতো। 

নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরই কাইলারের মনে হয়, নিশ্চয়ই নতুন জুতা না পরার কারণে তার মতো অন্য অনেক স্কুল পড়ুয়াদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটছে। 

কাইলার বলে, ‘ আমার স্কুলে ভালো জুতা পরা একটা বড় ব্যাপার ছিল। নামি ব্রাণ্ডের জুতা সবাই ব্যবহার করতো।’

কাইলার জানান, আর কোনো শিশু যাতে জুতা নিয়ে স্কুলে লজ্জা  বোধ না করে এ চিন্তা থেকে সে জুতা সংগ্রহ করার চিন্তা করে। 

এ চিন্তা থেকেই সে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে একটা জুতা দানের বাক্স খুলে বসে। 

কেইলার কলোরাডো স্প্রিংসের বেশ কয়েকটি স্টোরের কাছ থেকে গ্রাহকদের নতুন এবং অল্প ব্যবহৃত জুতা সংগ্রহের জন্য বড় কার্ডবোর্ডের বাক্সগুলি রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন।

ওই বাক্সগুলির ওপরে ‘কেইলারস কিক’  লিখে সে দুস্থদের জন্য জুতা দানের আহবান জানিয়েছিল সবার প্রতি। 

এ কাজ শুরুর চার মাসের মধ্যে বহু মানুষ ‘কেইলারস কিকে’ জুতা দান করতে শুরু করেন। অনেকেই স্বল্প ব্যবহৃত , ব্যবহৃত জুতা দিতে থাকেন সেখানে। কেইলারের মা শেরিস নিপার জানান, স্থানীয় একটি ব্যবসায়িক সংস্থা মাসে একবার তাদের বাস ব্যবহারের সম্মতি দিয়েছিল যাতে তিনি এবং কাইলার আশেপাশের স্বল্প আয়ের পরিবারের কাছাকাছি যেতে পারেন। এতে করে ওইসব পরিবারের সদস্যরা তাদের পছন্দ মতো জুতা বাছাই করতে পারবেন তাদের সংগ্রহশালা থেকে। 

২০১৭ সালের মার্চ মাসে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে কেইলারের পরিবার লাস ভেগাসে স্থায়ী হয়। নিজেদের আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও সেখানে গিয়ে কেইলার তার জুতা সংগ্রহ ও দানের কাজ থামায়নি। শিশু, অল্প বয়সী এবং গৃহহীনদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৫ হাজার জুতা জোড়া দান করেছে কেইলার। 

কেইলারের এ উদ্যোগে সাড়া দিয়ে অনেকেই এখন তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মার্কিন পপ শিল্পী লেডি গাগার ‘বার্ন দ্য ওয়ে ফাউন্ডেশন’ এবং ‘জ্যাপসস ফর গুড’সহ অনেক কোম্পানিই এখন কেইলারের বাক্সে জুতা দান করছে।

বার্ন দ্য ওয়ে ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মায়া স্মিথ বলেন, ‘কেইলারের মতো তরুণদের কাজ দেখে খুব মুগ্ধ হই এবং গর্ব বোধ করি।’ তার ভাষায়, এমন দয়ালু তরুণই আগামী  বিশ্ব গড়ার মূল চাবিকাঠি।

যাদের ভালো জুতা কেনার সামর্থ্য নেই তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে দারুণ আনন্দ পান কেইলার। একদিনের ঘটনা স্মরণ করে কেইলার জানায়, একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় গৃহহীন একজন মানুষকে সে খালি পায়ে হাঁটতে দেখেছিল। লোকটির পায়ের আকৃতি আর নিজের পায়ের আকৃতি একই মনে হয়েছিল তার। তাৎক্ষণিকভাবে  সে নিজের পায়ের জুতা খুলে লোকটিকে পরতে বলে। লোকটি খুশী হয়ে সেই জুতা জোড়া পরে চলে যায়। কেইলারও আনন্দিত হয়। কেইলার জানায়, ওটা তার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত ছিল। সূত্র : এনডিটিভি