ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

গাইবান্ধায় 'বুথে ডাকাত'

নেপথ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা

নেপথ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা

ফুলছড়ি ও সাঘাটা (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১৪:০৩

বন্ধ হয়ে যাওয়া গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচনের রেশ এখনও কাটেনি। সময়ের সঙ্গে আসছে নতুন নতুন তথ্য। 'বুথে ডাকাত'-এর জন্য বিরোধীরা দায়ী করছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে। তাঁরা জানান, ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়নের সবক'টি ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আজহারুল হান্নান মণ্ডল। প্রতিটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকে ভোট নেওয়ার চেষ্টা চালায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় কোনো চরেই যাননি নির্বাচন পর্যবেক্ষক। সংবাদকর্মীদেরও পদচারণা ছিল না। এ সুযোগটি তারা বেশি কাজে লাগিয়েছে। এই ইউনিয়নে দায়িত্বরত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করারও অভিযোগ মিলেছে।

এ বিষয়ে আজহারুল হান্নান সমকালকে বলেন, আমি গিয়েছিলাম ঠিকই। সেখানে আমার জন্মস্থান, আমি সেখানকার ভোটার। তবে প্রভাব বিস্তার করিনি। অন্য কেউ করে থাকতে পারে।

একই অবস্থা ছিল গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারীর সবক'টি ভোটকেন্দ্রের। সেখানে গজারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম খুশিসহ তাঁর নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে পাহারা বসিয়ে রাখে। স্থানীয় জাতীয় পার্টির একজন দায়িত্বশীল নেতা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তবে খোরশেদ আলম বলেন, এই ইউপির কাতলামারীতে আমার জন্মস্থান। আমি সেখানে যাব, এটাই স্বাভাবিক। তবে পাহারা বসিয়ে রাখিনি।

উদাখালী ইউনিয়নের সিংরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের ভয় দেখিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মেরেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম আলী। সেখানকার ভোটার আজিজার রহমানের দাবি, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ভোট ডাকাতির কার্যক্রম চলে। তার প্রশ্ন- এত পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি, র‌্যাব দিয়ে লাভ কী!

যমুনা নদীর মাঝে চর এরেন্ডবাড়ি ইউনিয়নে একই অবস্থা। আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান আকন্দ এবং তাঁর লোকজন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রভাব খাটান। এখানে একাধিক কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তবে এসব বিষয়ে জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র ও বিকল্পধারার প্রার্থীর সমর্থকরা কোনো তথ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, এসব উল্লেখ করলে এলাকাছাড়া হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান আকন্দ বলেন, আমাদের ফাঁসাতে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। কারা ক্যামেরা ঢেকে দিয়েছে, তা নির্বাচন কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন। এখানে আমরা গ্রাম রাজনীতির শিকার।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের এমএইউ একাডেমি ভোটকেন্দ্র ছিল ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জিএম সেলিম পারভেজের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে তাঁরই নেতৃত্বে নৌকা মার্কার টি-শার্ট পরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করার পর গোপন কক্ষে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দেয়। কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। এরা জাতীয় পার্টির এজেন্ট ও কর্মীদের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেয়।

অভিযোগ স্বীকার করে পারভেজ জানান, আমাদের নিজেদের কেন্দ্র। আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা যা করিনি, সেটারও দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। জনগণ তাদের ইচ্ছাতেই ভোট দিয়েছে।

সমিতির বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহেল পারভেজের হাতে। তাঁর নেতৃত্বে নৌকা মার্কার টি-শার্ট পরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাতীয় পার্টির এজেন্টদের বের করে দিয়ে কেন্দ্রের দখল নেয়। সোহেল পারভেজ জানান, টি-শার্ট আমাদের আগে থেকেই ছিল। ভোটের দিন উপলক্ষে দেওয়া হয়েছে, এমন নয়। আর আমরা নৌকা ভালোবাসি, তাই নৌকার প্রতীক গায়ে দিয়েছি।
জাতীয় পার্টির নেতা ফয়সাল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা আমাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। এটা একটা ভোট হলো? কীসের ইভিএম! সরকারের এটা চালাকি।

উপজেলার ফুলছড়ি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ওবাইদুল ইসলাম, সুজনসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গোপন বুথে ঢুকে অন্যের ভোট দিয়ে দেয়। এখানে জাতীয় পার্টির এজেন্ট সুমন মিয়া, হাবিবুর ও মিন্টুকে ভোটকেন্দ্র থেকে মারধর করা হয়। এ কেন্দ্রের পাশে বাড়ি জাতীয় পার্টির নেতা শফিউল ইসলাম চাঁন। তাঁকে ভোটের আগের রাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে অভিযোগ করা হয়।

লাঙ্গল মার্কার এজেন্ট হাবিবুর বলেন, আমি একটি দলের সাপোর্ট করতেই পারি। আমার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে। ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। তাহলে কেন আমাকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিল? সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলে প্রমাণ মিলবে।
তবে যুবলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, কারা জোর করেছে, বলতে পারব না। তবে আমরা কেন্দ্রে ছিলাম- এটা সত্যি।

এদিকে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাঘাটার রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তার করায় প্রথম ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়। এর পরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সব কেন্দ্রে।

কঞ্চিপাড়া এমএইউ একাডেমি কেন্দ্রের ইনচার্জ এএসআই অজয় রায় বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি; কোনো জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেনি। কঠোর নিরাপত্তা জোরদার ছিল। আমরা সব সময় সজাগ ছিলাম। গণমাধ্যমকর্মীরাও এখানে ছিলেন।

সাঘাটা উপজেলার দলদলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, এখানে সামান্য ঝামেলা হয়েছিল। কয়েকজন লোক বুথে ঢুকে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে। আমরা দ্রুত তা সমাধান করি। তারা কারা- জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতে পারেননি।

ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জিএম সেলিম পারভেজ বলেন, 'নির্বাচন বন্ধ নির্বাচন কমিশনের হটকারী সিদ্ধান্ত। কোনো অভিযোগ ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত রহস্যজনক। ভোটের মাঠে একটা লাশও পড়ল না; একটা মানুষও আটক হলো না। কোনো বিশৃঙ্খলাই হয়নি নির্বাচনে। তবে কেন বা কী কারণে ভোট বন্ধ করা হলো- তা স্পষ্ট নয়। অবিলম্বে সিইসির পদত্যাগ চাই আমরা।

তবে গাইবান্ধা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালিব জানান, বুধবারের ভোট জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের কারণে প্রিসাইডিং অফিসার মাজেদুল ইসলাম বাদী হয়ে রাতে সাঘাটা থানায় সুজন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

সিইসির পদত্যাগ দাবিতে সড়ক অবরোধ :গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের পদত্যাগ এবং ফলাফল ঘোষণার দাবিতে গতকাল ফুলছড়িতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধরা। এ ছাড়াও উপজেলা পরিষদের গেটে তালা লাগিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধা-ফুলছড়ি সড়কে ফুলছড়ি উপজেলা চত্বরের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে নৌকা মার্কার প্রার্থী মাহমুদুল হাসান রিপনের পক্ষের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এ সময় উপজেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়েও বিক্ষোভ করে দলীয় নেতাকর্মী। এতে সড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ায় দুর্ভোগের শিকার হন সাধারণ যাত্রীরা।

ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জিএম সেলিম পারভেজের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক অংশ নেয়। এ সময় বক্তব্য দেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা হাবিবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন, ফজলুল হকসহ অন্যরা।

আরও পড়ুন

×