ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য লাভ নেই খামারিদের

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য লাভ নেই খামারিদের

আজু শিকদার, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২২ | ০০:০৪

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ছোট ভাকলা ইউনিয়নের খামারি মিরাজ উদ্দিন। ২৫ বছর ধরে মুরগির ডিম উৎপাদনে যুক্ত তিনি। তবে ডিমের দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হয়। লোকসান হলেও ওই দামেই বিক্রি করতে বাধ্য তিনি। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা ডিম নিয়ে গেলেও তাঁরা জানেন না ডিমের দাম কত? সারাদিন পর রাতে তাঁদের দাম জানানো হয়।

মিরাজ উদ্দিন বলছিলেন, ডিমের দাম বাড়ায় দেশে হইচই হলেও এখনও তাঁরা লোকসানে। খাবারের দাম বাড়ার কারণে একটি মুরগি প্রতিদিন খাবার খায় ৮-৯ টাকার। পরিচর্যাসহ একটি ডিমের উৎপাদন খরচ পড়ে ১০ টাকার বেশি। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে ভোক্তারা ১২-১৩ টাকায় কিনছেন সেই ডিম।
বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে ডিমের দাম লাগামহীন। অনেকটা নাগালের বাইরে নিম্ন আয়ের মানুষের। কয়েক মাস আগে ১০০ থেকে ১১০ টাকা ডজন বিক্রি হলেও এখন ১৫০ টাকার আশপাশে রয়েছে দাম। এই অস্বাভাবিক দামের সময়ে ভালো নেই খামারিরাও। সুবিধা ভোগ করছে তৃতীয় একটি পক্ষ। খরচ বেড়ে যাওয়ায় গোয়ালন্দের অনেক খামার বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ জন্য সিন্ডিকেট এবং খাবারসহ অন্যান্য সামগ্রীর মূল্যস্ম্ফীতিকে দায়ী করছেন তাঁরা।

খাতসংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, পোলট্রি খামারের সংখ্যায় দেশের শীর্ষস্থানীয় উপজেলা গোয়ালন্দ। তবে এ এলাকায়ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তৃতীয় একটি পক্ষ বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিলেও খামারিরা টিকে থাকতে সংগ্রাম করছেন। সাম্প্রতিক সময়ের মতো ডিমের বাজার আর কখনও অস্থিতিশীল হয়নি। নানা অজুহাতে দাম বাড়লেও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি ক্রেতা থেকে শুরু করে খামারিরাও। প্রতিদিন মেসেজের মাধ্যমে ডিমের দাম নির্ধারণ করেন তাঁরা।

দৌলতদিয়ার পোলট্রি খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, চার বছর ধরে মুরগির ডিম উৎপাদন করছেন তিনি। বছরের ৯ মাসই লোকসান থাকে। এক বছর আগে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ছিল ৮ টাকা। বিক্রি হতো ৯ টাকা পর্যন্ত। চার মাস আগে ডিমের দাম বাড়লেও কিছুটা লাভ হয়। তবে এখন উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ টাকা। ১১ টাকা পর্যন্ত দাম পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

খামারিরা জানান, কয়েক দিনের ব্যবধানে মুরগির খাবারের দাম কেজিতে বেড়েছে আড়াই টাকা পর্যন্ত, যা বস্তাপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। এই অস্বাভাবিক দামের কারণে এরই মধ্যে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। পৌর এলাকার খামারি নুরে আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি পোলট্রি খামারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও খাবার, ওষুধসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখনও তেমন লাভের মুখ দেখেননি। এরই মধ্যে তাঁর খামারের মুরগি রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এতে অন্তত ২০ লাখ টাকা লোকসান হলেও পুঁজি সংকটে নতুন করে শুরু করতে পারেননি।

উপজেলা পোলট্রি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান জানান, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে ৩০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক খামারি পুঁজি সংকটে পড়ে বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে উৎপাদন করলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে অস্থিরতা কেটে যাবে।

স্থানীয় ডিম ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি প্রতিদিন এক লাখের বেশি ডিম কেনাবেচা করেন। তবে দাম নির্ধারণে তাঁর কোনো হাত নেই। ঢাকা থেকে মেসেজ আসে, সে অনুযায়ী ডিম কেনাবেচা করেন। গোয়ালন্দ বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যবসায়ী জানান, একটি বড় ডিম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ডিপো থেকে দাম নির্ধারণ করে দেয়। সে অনুযায়ী তাঁরা কেনাবেচা করেন।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোলট্রি জোন হলেও গোয়ালন্দেরর খামারিরা দুরবস্থার মধ্যেই রয়েছেন। খাবারের দাম সহনশীল না হলে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ ও এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। ইতোমধ্যে খামারিদের সুবিধার্থে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×