ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

সাভারের 'নিরিবিলি' বস্তি বিল্লাল'কীর্তি'তে নেই স্বস্তি

সাভারের 'নিরিবিলি' বস্তি বিল্লাল'কীর্তি'তে নেই স্বস্তি

বিল্লাল হোসেন

শামসুজ্জামান শামস

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৫:১৬

জীবন চলার বাঁকে বাঁকে গিরগিটির মতো বদলেছে রং। কখনও বিদ্যুৎমিস্ত্রি, কখনও কাঠমিস্ত্রি, আবার কোনো সময় মুদি দোকানি। সাত ঘাটের জল খেয়ে বিল্লাল হোসেন এখন থিতু মাদক কারবারে; জমি দখলেও তাঁর পাকা হাত। সাভারের আশুলিয়ার নিরিবিলি মুক্তধারাকে সবাই চেনে 'নিরিবিলি বস্তি' নামে। সেই বস্তিতে বিল্লাল হোসেনই যেন শেষ কথা। 'বিল্লাল ভাই' নাম শুনলেই বস্তিসহ আশপাশের মানুষের বুকে ধরে কাঁপন! বস্তির নাম 'নিরিবিলি' হলেও সেখানে নেই দুদণ্ড শান্তি।

আশুলিয়ার ডেন্ডাবর এলাকায় বিল্লাল হোসেনের বাস। বয়স কমবেশি ৫৫। অনেক আগে স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী পিয়ার আলী দেওয়ানের এক আত্মীয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বিল্লাল পান 'জাদুর কাঠি'। নাম লেখান মাদক কারবারে। ডেন্ডাবর থেকে দুই কিলোমিটার দূরেই বস্তি নিরিবিলি। সেখানেই বিল্লালের 'মাদক রাজ্য', আছে রংবাজ দল। বিল্লালের ঘনিষ্ঠজন একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, মাদকের ডিলার বিল্লাল বস্তির কারবারিদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ টাকা করে পকেটে তোলেন। অভিযোগ আছে, বিল্লালের মাদক চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই জড়ানো হয় মিথ্যা মামলায়; করা হয় নানা হয়রানি। আর জমি দখলে রয়েছে তাঁর অন্য রকম দক্ষতা। তাঁর ছলাকলায় আটকা পড়েন গ্রামের সরল মানুষ।

বিল্লালের 'মাদকরাজ্য': নিরিবিলি বস্তির পাশেই বিশাল কাশবন। সেখানেই ছোট ছোট দলে গোল হয়ে বসে আছেন চার থেকে পাঁচজন করে যুবক। কেউ সাজাচ্ছেন গাঁজা, কেউ আবার নেশায় বুঁদ। একজনের নাম মনির, তিনি রিকশাচালক। এই প্রতিবেদক মাদক ক্রেতা পরিচয় দিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা শুরু করেন। মনির বলেন, 'সকালে একবার টাইনা যাই। সারাদিন রিকশা চালাইয়া সন্ধ্যায় আবার ওষুধ (গাঁজা) খাইয়া তার পর বাড়ি যাই। সামনে আওগাইলে যা চান, সবই পাইবেন।'

মাদক কেনাবেচা সহজ করতে বিল্লাল গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট। তাঁর মাদকের মূল স্পট নিরিবিলি বস্তি। এ ছাড়া আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন এলাকার মাদকভেদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্নজনকে। মনির নামের এক ব্যক্তি গাঁজার বিষয়টি দেখভাল করেন। এ ছাড়া সহযোগী হিসেবে রয়েছেন বিল্লালের বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত রানা। ইয়াবার সিন্ডিকেটে রয়েছেন রানা, মঞ্জু, তুন্তি, মামুন, টিটু ও সাইদুল। হেরোইনের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে রয়েছেন 'মাদকসম্রাজ্ঞী' জুলেখা বেগম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সড়কপথে মাদক আসে বিল্লাল সিন্ডেকেটের হাতে। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক যায় নিরিবিলি বস্তি, নবীনগর, আশুলিয়া, আউকপাড়া আদর্শ গ্রাম, নামাবাজার, কাউন্দিয়া দ্বীপ, নামাগেন্ডা, ব্যাংক কলোনিসহ বিভিন্ন স্থানে। এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরা, গাবতলী ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে মাদক ছড়িয়ে দেয় বিল্লালের দলবল।

বিল্লালের এসব অপরাধের বিষয়ে মুখ খোলার সাহস নেই স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে যাঁরাই সামনে থেকে বিল্লালের মাদকসম্রাজ্যের বিষয়ে কথা বলেছেন কিংবা আন্দোলন করছেন, তাঁদের অধিকাংশকেই পরে বিভিন্ন সাজানো মামলার আসামি হতে হয়েছে। ২০১৮ সালের দিকে মাদক মামলায় কারাগারে থাকার সময় সেখান থেকেই মাদকের নিয়ন্ত্রণ করেন বিল্লাল। পরে জামিনে বেরিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন।

হরেক মামলার আসামি: ২০ বছর আগে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংস্কারের সময় রড, পাথরসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী চুরির দায়ে বিল্লালের নামে প্রথম মামলা হয়েছিল। এর পর আশুলিয়াসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানায় বিল্লালের নামে মাদক, হত্যা, চুরি ও মারধরের অভিযোগে হয়েছে রকমারি মামলা। এর মধ্যে আশুলিয়া থানায় ২০০৬ সালে হত্যা মামলা, ২০১১ সালে একই থানায় চুরি ও প্রাণনাশের হুমকির মামলা, ২০১৪ সালে সবুজবাগ থানায় কর্মচারী দিয়ে মোটরসাইকেল চুরিসহ প্ররোচনার মামলা, ২০১৮ সালে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় মাদক মামলার আসামি হন তিনি।

কত সম্পদ: বিল্লালের কিশোর জীবনটা ছিল কষ্টের। এখন তাঁর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, অঢেল সম্পদ। মাদক ও জমি দখল করে তিনি উঠেছেন শিকড় থেকে শিখরে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০ বছরের মধ্যে তিনি অন্তত সাত বাড়ির মালিক। সাভারের বিভিন্ন স্থানে আছে কয়েক বিঘা জমি। আছে একাধিক দোকান। সব মিলিয়ে কম করে হলেও ৫০ কোটি টাকার সম্পদ। বেশ কয়েক বছর আগে বিল্লালকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হলে- সম্পদের উৎস-সংক্রান্ত প্রশ্ন এড়াতে অনেক সম্পত্তি তিনি ভাইদের লিখে দেন। নিরিবিলি এলাকায় গিয়ে বিল্লালের একাধিক বাড়ির ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু বস্তি এলাকাতেই বিল্লালের রয়েছে চার থেকে পাঁচটি বাড়ি। তাঁদের দাবি, শেষ আট বছরের মধ্যে এসব বাড়ি করেন বিল্লাল।

যে কৌশলে জমি দখল: জমি দখলের ক্ষেত্রে কৌশলে মাদক চক্রের সদস্যদের ব্যবহার করেন বিল্লাল। অভিযোগ রয়েছে, বিল্লাল তাঁর আস্থাভাজনদের দিয়ে রাতের আঁধারে অন্যের জমিতে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ওই জমি দখলকারী ব্যক্তির বলে দাবি করান। পরে প্রকৃত মালিক জমি উদ্ধারে এলে দখলকারী নিজেরা নিজেরা হাঙ্গামার নাটক সাজিয়ে জমি উদ্ধার করতে আসা ব্যক্তিদের নামে মামলা ঠুকে দেন। পরে ওই জমি নানা চাতুরী করে দখলে নেন বিল্লাল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, 'নিরিবিলি এলাকায় আমার কেনা জমিতে ১০ থেকে ১৫ জনের নাম লিখে মালিক দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে বিল্লালের লোকজন। অপেক্ষা করছি; যদি সাইনবোর্ড সরিয়ে না নেয়, তবে জমি ফেরত পেতে আইনের আশ্রয় নেব।

সাজানো মামলায় শায়েস্তা: নিরিবিলি বস্তিতে মাদকের কেনাবেচা রোধে সিন্ডিকেটের সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবিতে বিভিন্ন সময় সচেতনতামূলক সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় অনেককে বিল্লালের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন সাজানো মামলায় জড়ানো হয়।

আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সফিউল আলম সোহাগ বলেন, 'বিল্লালের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলে, তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়।'

পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান বলেন, 'বিল্লালের নাম উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় একাধিকবার উঠেছে। মাদকসহ অন্য সব অপরাধে যার নামই থাকুক, তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে হবে।' তিনি বলেন, 'মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এক ইউপি সদস্যের নামে বিল্লাল মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এভাবে চললে তো কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাবে না।'

বিল্লাল বিদেশে: নানা অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ডেন্ডাবরে বিল্লালের বাড়িতে গেলে তাঁর স্ত্রী জানান, বিল্লাল দেশের বাইরে। এসব বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি নন। তবে বিল্লালের ভাই আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'বিল্লালের নামে যেসব মামলা হয়েছে, সব উদ্দেশ্যমূলক। মামলাগুলোতে সাক্ষীরা বিল্লালের পক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। এমনকি বাদীরাও তাদের ভুল বুঝতে পেরে মামলা নিষ্পত্তির জন্য বলছে। দ্রুতই সব মামলার রায় হবে। রায় আমাদের পক্ষেই আসবে।' মাদক কারবার ও জমির দখলের ব্যাপারে তিনি বলেন, 'জমি দখল একটি ভুয়া বিষয়। কাগজ না থাকলে জমি নেওয়া সম্ভব নয়। একটা সময় ছিল, যখন পিয়ার আলী দেওয়ানের নাম শুনলে সবাই ভয় পেত; ওনাদের সময় এগুলো চলত। এখন এগুলো সম্ভব নয়। বিল্লালের শত্রু বেড়ে যাওয়ায় এমন অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় কিছু জমির ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাঁদের স্বার্থে আঘাত লাগায় তাঁরা এমন অভিযোগ করছেন। মূলত পৈতৃক সম্পত্তি ও জমির ব্যবসা করেই তিনি বাড়ি করেছেন।'

নিরিবিলি বস্তির প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচতলা বাড়িটি আবুল কালাম আজাদ প্রথমে বিল্লালের বলে জানান। পরে তিনি বাড়িটি পৈতৃক সম্পত্তি এবং সব ভাইবোনের নামে রয়েছে বলে দাবি করেন। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়িটি করা হয়েছে বলেও যোগ করেন তিনি। তবে এর আগে ওই বাড়ির ব্যবস্থাপক বাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাড়িটি বিল্লালের বলে সমকালকে জানান।

পুলিশের ভাষ্য: আশুলিয়া থানার ওসি এস এম কামরুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'মাদকের বিস্তার রোধে ও কারবারিদের ধরতে আমরা আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। মাদকের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। বিল্লালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলার বিষয়টি যাচাই করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'বিল্লালের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। শিগগিরই তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে।'

আরও পড়ুন

×