ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

সব ইটভাটাই অবৈধ

সব ইটভাটাই অবৈধ

এসএম কাওসার, বগুড়া

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ০০:২৪

শর্ত পূরণ করেনি বগুড়া জেলার ২৩৫টি ইটভাটা। তাই লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। এরপরও চলছে এগুলো। প্রশাসন বলছে, তালিকাভুক্ত হচ্ছে। তবে জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির দাবি- লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইটভাটা শিবগঞ্জ, গাবতলী, শেরপুর, শাজাহানপুর ও ধুনট উপজেলায়। এর মধ্যে শিবগঞ্জে ৪৪টি ইটভাটা রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শাজাহানপুর উপজেলা। সেখানে ইটভাটার সংখ্যা ৩৭। ৩২টি আছে গাবতলী উপজেলায়। শেরপুরে ৩১ ও ধুনটে ২৮টি। এ ছাড়া কাহালু, আদমদীঘি, দুপচাঁচিয়া, সোনাতলা, সারিয়াকান্দিতে রয়েছে অসংখ্য ইটভাটা।

ইটভাটা মালিকদের মধ্যে সরকারি দলের নেতারাও আছেন। তাঁরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন সমিতির। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ আবুল কালাম আজাদ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতিরও সভাপতি। গাবতলী উপজেলায় শাপলা ব্রিকস নামের ইটভাটাটি তাঁর। কোষাধ্যক্ষ মাসুদার রহমান মিলনের (মাসুমা ব্রিকস) ইটভাটাটি সদরের শেখেরকোলা এলাকায়। এটি পরিচালনা করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজ। শাজাহানপুরের চাঁচাইতারা এলাকায় রয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালেবুল ইসলামের ইটভাটাটি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব ইটভাটার বেশিরভাগ লোকালয়ে। আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হাসপাতাল ও এলজিইডির রাস্তার সামনে। শিবগঞ্জের আমতলীতে এমএইচ ব্রিক, পূর্ব জাহাঙ্গীরাবাদে মিতালী ট্রেডার্স, আলাদিপুরে এমকে ব্রিকস রাস্তা ও ফসলের মাঠে স্থাপন করা হয়েছে। গাবতলীতেও একই অবস্থা। সেখানে এমজি ব্রিকস, এমএসএস ট্রেডার্স, এমবিএস ব্রিকস। শাজাহানপুরের সুজাবাদ এলাকায় পাঁচটি ইটভাটাও ফসলের মাঠে এবং এলজিইডির রাস্তা ঘেঁষে স্থাপন করা হয়েছে। এসব কারণে বিভিন্ন সংস্থা- ট্রেড, বিএসটিআই, কলকারখানা, ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসন থেকে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। আয়কর ও ভ্যাট সনদ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও পায়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ইটভাটা পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ১২০ ফুট উচ্চতার চিমনির পরিবর্তে জিগজ্যাগ পদ্ধতির চুলা ব্যবহার। এলজিইডির রাস্তা থেকে ৫০০ মিটার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হাসপাতাল থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে স্থাপন করতে হবে। আবাদি জমি থেকে মাটি আহরণ করা যাবে না। কোন জায়গা থেকে মাটি আহরণ করা হবে, তার একটি চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে ছাড়পত্রের জন্য। মাটির ব্যবহার হ্রাস করতে ৫০ শতাংশ ফাঁপা ইট তৈরি করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলেই কেবল পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিয়ে থাকে। বগুড়ায় যে ২৩৫টি ইটভাটা রয়েছে, এর কোনোটিই এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। যার কারণে নতুন লাইসেন্স দেওয়া বা নবায়ন বন্ধ রয়েছে প্রায় তিন বছর।

পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মাহাতির মোহাম্মদ বলেন, শর্ত পূরণ না করায় একটি ইটভাটাকেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ফলে জেলার সব ইটভাটাই অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজ বলেন, শতভাগ আইন মেনে ইটভাটা পরিচালনা করা সম্ভব না। যতটুকু পারছি আইন মেনেই ভাটা চালাচ্ছি।

জানা গেছে, গত ৭ নভেম্বর বগুড়া, টাঙ্গাইল, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও- এ চার জেলার অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম সাত দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে সংশ্নিষ্ট চার জেলা প্রশাসককে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এ নির্দেশনার পর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে।

সে সময় সমিতির জেলা সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন করতে জেলার সব ইটভাটার মালিক আবেদন করেছেন। কিন্তু আটটি সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও ছাড়পত্র পেতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত জটিল। এ শর্ত দেশের কোনো ইটভাটা পূরণ করতে পারেনি এবং পারবেও না। শর্ত শিথিল করা না হলে ইট তৈরি সম্ভব নয়। এতে উন্নয়নও ব্যাহত হবে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি তিনটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে রিট করব।

ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল সিদ্দিকী বলেন, ফসলি জমির পাশের ইটভাটাগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) সুফিয়া নাজিম বলেন, বগুড়ায় সব ইটভাটাই অবৈধ। তাই এগুলোকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক বলেন, তিনটি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের চিঠির কপি পেলে বাকিগুলোতেও অভিযান চালানো হবে।

আরও পড়ুন

×