ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

ভাড়াটে লোকের পাহারায় নদীর বালু লুটপাট বিএনপি নেতার

ভাড়াটে লোকের পাহারায় নদীর বালু লুটপাট বিএনপি নেতার

বাসাইল উপজেলার কাশিল উত্তরপাড়া এলাকায় ঝিনাই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন - সমকাল

আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ০৩:৪৪

টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই দিনের পর দিন অবৈধভাবে খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। এভাবে বালু তোলার অভিযোগ বাসাইল উপজেলার বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী শহিদুল ইসলামের ভাই কাজী বাদল মিয়ার বিরুদ্ধে। ভাড়াটে লোকের পাহারায় অবাধে চলছে বালু লুটপাট।

বাদল মিয়ার ভাষ্য, চীনের একটি কোম্পানি এখানে হাঁস-মুরগির খাদ্য তৈরির কারখানা করবে। তাই নিচু জমি ভরাটের জন্য ৮০ লাখ বর্গফুট মাটি দরকার। মাটি ভরাটের ঠিকাদারি নিয়েছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে সবার চোখের সামনে দেড়-দুই কিলোমিটার রাস্তায় পাইপ ফেলে বাসাইলের ঝিনাই নদী থেকে বালু তুলে কারখানার জায়গা ভরাট করছেন বাদল মিয়া। বড় ধরনের খননযন্ত্র বসিয়ে বালু তোলার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে নদীপাড়ের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নথখোলা কাশিল সেতু। এতে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে আবেদন করেছেন। করেছেন মানববন্ধনও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বালু তোলার কাজ দেখাশোনার জন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করলে তাদের বাধা দেওয়া যায়।

গত বুধবার কাশিলের ঝিনাই নদীতে গিয়ে দেখা গেছে, কাশিল প্রধান সড়ক ঘেঁষেই কারখানার জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নদী থেকে পাইপ দিয়ে বালু টেনে আনা হচ্ছে। রাস্তা থেকে কিছুদূর গেলে চোখে পড়বে বড় বড় বাল্ক্কহেড। যেগুলো দিয়ে দূর থেকে মাটি এনে এক জায়গায় রাখা হয়। পরে সেই মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে খননযন্ত্রের মাধ্যমে পাইপের সাহায্যে দূরে ফেলা হচ্ছে। এটা লোক দেখানো। আরও ভেতরে গেলে দেখা যাবে, পাইপ দিয়ে গ্রামের ভেতর বিভিন্ন বাড়িঘরের পাশ দিয়ে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে।

কাশিল উত্তরপাড়া বাজারের চা স্টলে কথা হয় উজ্জ্বল নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'বসে বসে ৮ হাজার টাকা বেতন পাই। আমার মতো অনেকেই বেতন পাচ্ছে। আমরা জানি নেতা, প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড- সবাইকে ম্যানেজ করেই বালু তোলা হচ্ছে। ম্যানেজ না হলে তারা কেন তুলতে দিচ্ছে? গ্রামবাসী গোল্লায় যাক, প্রভাবশালীদের পকেট ভরলেই হলো।'

নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু তোলায় দুই পাড় ভেঙে যাচ্ছে। উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন এলাকার লোকজন। স্থানীয়দের মতে, বালু উত্তোলন রোধে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বাড়িঘর ও আবাদি জমিসহ সব কিছু হারাতে বসেছেন তাঁরা। এরই মধ্যে ভাঙন আতঙ্কে কয়েকটি পরিবার তাদের সহায়-সম্বল নিয়ে অন্যত্র সরে গেছে।

ভুক্তভোগী শরিফ খান বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। বালুদস্যুদের কারণে বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বাদল মিয়া বলেন, 'নদী থেকে কোনো বালু তোলা হয় না। বাল্ক্কহেডে করে বাইরে থেকে বালু এনে নদীপাড়ে রাখা হয়। এরপর এখান থেকে পাইপের মাধ্যমে জমিতে ফেলা হয়। এ ছাড়া নদীপাড়ের জমি কিনে নিয়েছি। সেখান থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটা হয়। নদীর কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।'
বাসাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলামের ভাষ্য, কোনো অনুমতি না নিয়ে চোখের সামনে অবৈধভাবে বালু তুলছে। সবাই দেখছে; কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুন্নাহার রিতা জানান, কয়েক দিন আগেও কাশিলের ঝিনাই নদীতে অভিযান চালানো হয়েছে। আবারও অভিযান চলানো হবে।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ঝিনাই নদীতে বালু উত্তোলন বা খননের অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। কেউ বালু উত্তোলন করছে- এমন খবর নেই তাঁর কাছে। কেউ নিয়ম ভেঙে নদী খনন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলামের দাবি, বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির অভিযান চলানো হবে।

আরও পড়ুন

×