ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব বহু পরিবার

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব বহু পরিবার

প্রতীকী ছবি

ফারুক হোসেন, মেহেরপুর

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ০২:৩৯

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়েছে মেহেরপুরের অনেক মানুষ। বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকা। এই জেলায় অনলাইন জুয়া এখন জমজমাট। কিছু দিন আগে পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। এতে জেলার শীর্ষ জুয়াড়িরা গ্রেপ্তার হয়। এর পর থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন জুয়াড়িদের অনেকে। এসব খবর ছড়িয়ে পড়লে সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন অভিভাবকরা। গোয়েন্দা সংস্থা এখন পর্যন্ত ২৩১টি জুয়ার সাইটের তথ্য পেয়েছে। এসব সাইটে মেহেরপুরের হাজারো তরুণ জুয়া খেলায় জড়িত। এতে নিঃস্ব হয়েছে বহু পরিবার।

অনলাইন জুয়ার সাইটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ওয়ানএক্সবিট, বেট ৩৬৫ ডটকম, প্লেবেট ৩৬৫ ডটকম, বিডিটি ১০ ডটকম, উইনস ৬৫ ডটকম ও বেটস্কোর২৪ ডটকম।

তদন্তকারীরা মনে করেন, জুয়াড়িরা এখন আরও সতর্ক হয়ে গেছে। তারা নিরাপদে থেকে গোপনে অনলাইন জুয়া চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, গত আড়াই বছরে শত শত কোটি টাকা মেহেরপুরের জুয়াড়িদের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। অভিযানে অনেকেই গ্রেপ্তার হলেও জুয়া নির্মূল হয়নি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনলাইন জুয়া বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মামলার আসামি কয়েকজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সন্তানরা অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে যাওয়ায় সামাজিক মর্যাদাহানি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁরা। কোনো কোনো পরিবার প্রলোভনে পড়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে।

পুলিশ প্রশাসনের দাবি, ইতোমধ্যে জেলার শীর্ষ ৩২ জন অনলাইন জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানান, মেহেরপুর জেলার দুই শতাধিক এজেন্ট অনলাইন জুয়ায় জড়িত। তাদের মধ্যে মেহেরপুরের সরকারদলীয় নেতা, সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার দুই শতাধিক ব্যক্তি রয়েছেন।

বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে জুয়াড়িরা প্রকাশ্যে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও গোপনে সমানতালে চলছে জুয়া। এরই মধ্যে পথে বসেছেন হাজারো তরুণ। তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হারিয়েছেন সামাজিক মর্যাদা। পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের হাতে ধরা পড়েন মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামের নিমাই হালদার ও গোপালপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার বদরুদ্দোজা ওরফে রয়েল। তারা জানান, গ্রেপ্তার কোমরপুর গ্রামের একজন জুয়াড়ির সিমকার্ড (এজেন্ট) থেকে প্রতি মাসে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার মতো।

এদিকে মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে অনলাইন জুয়া নিয়ে অনুসন্ধান এবং কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে অনলাইন জুয়া নিয়ে উঠে এসেছে নানা তথ্য। সম্প্রতি ডিবি, সাইবার ক্রাইম বিভাগ, মুজিবনগর থানা পুলিশ ও গাংনী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদা মামলা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে রয়েল সাইবার ক্রাইমকে জানিয়েছেন, জুয়া সাইট ওয়ানএক্সবেটের মাস্টার এজেন্ট কোমরপুর গ্রামের মাহফুজুর রহমান ওরফে নবাব। তাঁর নেতৃত্বে রয়েছে অনলাইন জুয়ার আরও ১৫ জন সাব-এজেন্ট। তাঁদের নামে মামলা হয়েছে। ডিবির অভিযানে এসব জুয়াড়ি গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্যরা গা-ঢাকা দিয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার মতে, জুয়াড়িরা বিভিন্ন অ্যাপ ও সাইট ব্যবহার করে অনলাইনে বিভিন্ন গেমিং বেটিং বা বাজি খেলার সাইটে জুয়ায় মেতে উঠেছেন। বিট কয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার (ক্রিপ্টোকারেনসি) মাধ্যমে জুয়া খেলা হয়। অবৈধভাবে ডিজিটাল মুদ্রা কেনাবেচার মাধ্যমে আড়াই বছরে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা হুন্ডির মাধ্যমে যাচ্ছে বিদেশে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, একজন জুয়াড়ি মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলের মাধ্যমে প্রথমে বেটিং সাইট ওপেন করেন। একটি ই-ওয়ালেট তৈরি হয়, যাকে জুয়াড়িরা ইউএসডিটি বলে। শুরুতে ব্যালেন্স শূন্য থাকে। ওয়ালেটে ব্যালেন্স যোগ করার জন্য অনেক মাধ্যম রয়েছে। এর মধ্যে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় এবং ট্রাস্ট এজিয়াটা। এগুলোর যে কোনো একটি বেছে নিলে এজেন্ট নম্বর দেখা যায়। পরে নূ্যনতম ৫০০ টাকা জমা দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে ই-ওয়ালেটে যুক্ত হওয়া যায়। এ টাকা অথবা ব্যালেন্স দিয়ে জুয়া খেলা শুরু হয়। প্রতিটি এজেন্ট আগে ৬ শতাংশ কমিশন পেত। এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাওয়ায় এজেন্ট ধরে রাখতে ৯ শতাংশ কমিশন দেওয়া হয়।

মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিরুল ইসলাম জানান, জুয়াড়িদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল এনাম বকুল বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে মেহেরপুরের হাজারো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এজেন্ট বা ব্রোকাররা হঠাৎ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×