ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

পদের লোভে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিবাদ

পদের লোভে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিবাদ

প্রতীকী ছবি

শেখ আব্দুল জলিল, বেলাব (নরসিংদী)

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০

বেলাবর বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও তৃতীয় পক্ষের দ্বন্দ্বে পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। স্বার্থের মোহে বিদ্যালয়গুলো ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে একাধিক গ্রুপ। কয়েকটি বিদ্যালয়ে দেখা গেছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে এলাকার লোকদের সৃষ্ট গ্রুপে জড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরাও। পদ ও অর্থের লোভে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন অনেকে- এমন অভিযোগ ইউএনওর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একক আধিপত্য, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ম্যানেজিং কমিটিতে স্থান পাওয়া ও নিয়োগ বাণিজ্য করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই এসব গ্রুপ সৃষ্টির কারণ। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে নানা দ্বন্দ্ব। এসব দ্বন্দ্বে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষক, অভিভাবক প্রতিনিধিসহ এলাকার লোকজন। দ্বন্দ্ব নিরসনে এগিয়ে আসছেন না কেউ। দেওয়া হয়েছে একাধিক মামলা-মোকাদ্দমা।

বেলাব উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে সাতটি বিদ্যালয়ে বিবাদ চলমান। সাতটির বাইরে কিছু বিদ্যালয়ে সমস্যা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। অনুসন্ধান করতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক প্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। বিন্নাবাইদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। গত অক্টোবর মাস থেকে কোনো ছুটি ছাড়াই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত তিনি। কারণ হিসাবে জানা গেছে, বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মাসুদ হায়দারের লোকজন তাঁকে বিদ্যালয়ে আসতে বাধা দেন। মাসুদ হায়দারের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করেছেন এবং পক্ষপাতিত্ব করেন। এদিকে প্রধান শিক্ষক দুই মাস ধরে বিদ্যালয়ে না আসার কারণে অভিভাবকহীন বিদ্যালয়টির পাঠদান চলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। দুপুর হলেই বিদ্যালয় ছুটি দেন শিক্ষকরা- এ অভিযোগ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর।

দক্ষিণধুরু উচ্চ বিদ্যালয়ে চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ শ্রেণির চারটি পদে অনুষ্ঠিত হয় নিয়োগ পরীক্ষা। এতে কৃতকার্যদের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর দিতে বেঁকে বসেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল কালাম। তাঁর অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক আবু তাহের কৃতকার্য প্রার্থীদের কাছ থেকে নিয়েছেন অনৈতিক সুবিধা। এই নিয়ে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের মধ্যে সৃষ্টি হয় বিরোধ। এ বিরোধের কারণে উভয় পক্ষ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে একাধিক অভিযোগ দেয়। বিদ্যালয়ের ভেতরে ক্লাস না করে করা হয় একাধিক গ্রাম্য সালিশ। পরে প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির দ্বন্দ্বের কারণে পাঠদানে প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

গত ২৬ নভেম্বর বটেশ্বর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির পাঁচটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। কিন্তু পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের রাতেই কাকে কাকে কৃতকার্য দেখানো হবে, এমন ছাপানো পোস্টার এলাকায় ছড়িয়ে দেয় একটি পক্ষ। অভিযোগ ওঠে এ নিয়োগে অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে। পরে দেখা গেছে পোস্টারে উল্লেখ করা পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য দেখানো হয়। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়মমাফিকই হয়েছে।

দুদক কর্মচারী মাহবুবুর হাসান আফ্রাদের বিরুদ্ধে ভাবলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য হওয়ার উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী নূরুল আলম আফ্রাদের স্বাক্ষর জাল করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে ১০ লাখ ১০ হাজার টাকার ভুয়া রসিদ জমা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মাহবুবুর আফ্রাদের বড় ভাই ও বিদ্যালয়টির বর্তমান সভাপতি বাদল আফ্রাদের বিরুদ্ধেও বিদ্যালয়ের সোলার প্যানেল নিজ বাড়িতে স্থাপনের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের বিচার চেয়ে দুদক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার কাছে দেওয়া হয় একাধিক অভিযোগ। ফলে সাবেক ও বর্তমান সভাপতির সঙ্গে প্রধান শিক্ষক গোলাপ আফ্রাদের বিবাদ তৈরি হয়। এ বিবাদের প্রভাব পড়ে পাঠদানে। ভুক্তভোগী অফিস সহকারী নূরুল আলম আফ্রাদ সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু প্রয়াত অফিস সহকারীর স্বাক্ষর জাল করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার।

এ ছাড়া সুটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ধুকুন্দি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজারবাগ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষের বিবাদে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউএনও আয়শা জান্নাত তাহেরার ভাষ্য, টাকা ও পদের লোভে হয়তো কিছু কিছু বিদ্যালয়ে এ রকম হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়গুলোতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

আরও পড়ুন

×