এমপি রানা ঘাটাইলে মূর্তিমান আতঙ্ক

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬      

আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ঘাটাইলবাসীর কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহম্মেদ হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি পলাতক রয়েছেন। তার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র শহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাঁকন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পাসহ ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই অভিযোগ দাখিল করা হয়।

সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে মারধর, প্রয়াত ভাই বাপ্পী স্মৃতি সংসদের নামে ক্লাব বানিয়ে ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, প্রতিপক্ষের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, হামলা, লুটপাট,ভাংচুর, হুমকিসহ সব ধরনের অভিযোগ রয়েছে এ সাংসদের বিরুদ্ধে।


আত্মগোপনে থাকলেও যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করছেন তাদের মোবাইল ফোনে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তার কারণে ঘাটাইলে শিক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষক সংকট রয়েছে। সাংসদের হুমকির ভয়ে কর্তৃপক্ষ বারবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম শামসুল হক শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে ঘাটাইল পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নেন। এ কারণে এমপির ক্যাডার বাহিনী তাকে লাঞ্ছিত করে। গত ৩ আগস্ট এমপি নিজে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে নিয়োগ বন্ধের নির্দেশ দেন।
নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যারা


ঘাটাইলের দীঘলকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ইকবাল হোসেন খান। এমপির ক্যাডার বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি ও তার ছেলে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। তার অপরাধ, ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর উপনির্বাচনে তার পক্ষে কাজ না করে তিনি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী শহিদুল ইসলাম লেবুর পক্ষে কাজ করেছেন। আবু হানিফ গৌরীশ্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার শরীরে ১৩টি চাপাতির কোপ। ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। হেকমত শিকদার ধলাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ভিজিএফের চাল বিতরণ হচ্ছিল। সেখানে এমপি রানার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড টিটুর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী উপস্থিত হয়। তারা ১০ বস্তা চাল দাবি করে। হেকমত সিকদার চাল দিতে অস্বীকৃতি জানালে টিটু বাহিনী ককটেল বিস্ফোরণ ও দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তার ক্যাডার বাহিনী তাকে মারধর করেছিল বলেও জানান তিনি। বেলুয়াটিকি গ্রামের মতিয়ার রহমান, লখীন্দর গ্রামের সোহরাব আলী, টেপড়িমোদন গোপাল গ্রামের মাজেদুল ইসলাম, রতনপুর গ্রামের মোস্তফা, সাগড়দীঘি দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি জিন্নত আলী, একই গ্রামের আরফান আলীসহ অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী রানার ক্যাডার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।


ভূমি দখল :এমপি হওয়ার পর থেকেই রানা ঘাটাইলে গড়ে তোলেন সাম্রাজ্য। ঘাটাইলের রসুলপুরে গড়ে তোলেন বাগানবাড়ি। অভিযোগ রয়েছে সেখানে তার নিজস্ব ক্রয়কৃত পাঁচ একর সম্পত্তি থাকলেও দখলে রয়েছে ২৬ একর। বাপ্পী স্মৃতি সংসদের নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে জমি দখল ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা। ঘাটাইল উপজেলায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি ক্লাব তৈরি করে জমি দখল করা হয়েছে। যারা বাধা দিত তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হতো তার ক্যাডার বাহিনী। মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ঘরছাড়া করত তাদের। এমনই এক ভুক্তভোগী লখীন্দর মৌজার ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেন ভঁূইয়া। সাগরদীঘি গ্রামের আবদুল জলিল ধলা মিয়া অভিযোগ করেন, সাগরদীঘি বাজারসংলগ্ন ৫৬ শতাংশ জমি দখল করে নেয় রানা এমপির লোকজন। সন্ধানপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নানের এক বিঘা জমি দখল করা হয়েছে। যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এভাবে রানা এমপি ও তার বাহিনী অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ভূমি দখল করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


তার নামে যত মামলা
২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ফারুক আহম্মেদ খুন হন। এ ছাড়া বিগত দিনে রানার বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ ৪৬টি মামলা হয়েছিল। জেলা ছাত্রদল নেতা রৌফ হত্যা ও আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কমিশনার রুমী চৌধুরী হত্যা মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা বিবেচনায় প্রভাব খাটিয়ে প্রত্যাহার করিয়েছেন। অপর ৪২টি মামলা কোনোটি আদালতের মাধ্যমে, কোনোটি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে শেষ করেছেন।


গত বছরের ১৪ জুলাই হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেন রানা এমপি। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে ১৫ দিনের মধ্যে নিম্ন আদালতে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চেম্বার জজ আদালত তাকে গ্রেফতার ও হয়রানি না করার পূর্ববর্তী দেওয়া আদেশ স্থগিত করেন। নিম্ন আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ বহাল রাখেন। সে নির্দেশ অমান্য করে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
নিহত ফারুক আহম্মেদের স্ত্রী নাহার আহম্মেদ বলেন, এমপি রানাসহ চার ভাই এ হত্যাকাণ্ডে যে জড়িত তা তদন্তে উদ্ঘাটিত হয়েছে। তারা গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, আসামিরা অত্যন্ত কৌশলে দেশ-বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা খুবই চতুর। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এমপি রানা পলাতক থাকায় এসব অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।


এদিকে মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় এমপি রানাসহ চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর থেকেই ঘাটাইলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বুধবার রাতে রানার অনুসারী এবং এমপিবিরোধীরা শহরে পাল্টাপাল্টি মিছিল করে ব্যাপক ভাংচুর করেছে। এ পরিস্থিতিতে র‌্যাব গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবুর অনুসারী চার ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করেছে। আটককৃতরা হলেন_ আবু সাইদ রুবেল, সোহেল, মঞ্জু ও মিতুল। পরে বিকেলে চার ভাইয়ের ফাঁসির দাবিতে শহিদুল ইসলাম লেবুর নেতৃত্বে উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। মিছিল শেষে ঘাটাইল বাসস্ট্যান্ড চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। সমাবেশে শহিদুল ইসলাম লেবু ছাড়াও বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুজ্জামান খান ভিপি শহিদ, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আ. রহিম প্রমুখ। বক্তারা এমপি রানাকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। তারা আটক চার ছাত্রলীগ নেতার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।