ভূমিতে নারীরও সমান অধিকার

সরেজমিন সুবর্ণচর-৫

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৭     আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৭      

রাজীব নূর ও জাহিদুর রহমান, সুবর্ণচর (নোয়াখালী) থেকে

ভূমিতে সমান অধিকার শুধু কাগজে নয়- কর্মেও প্রতিষ্ঠা করেছেন সুবর্ণচরের নারীরা -সমকাল

গোলাভরা ধান না থাকলেও নূরজাহান বেগমের আছে গোয়ালভরা গরু। অথচ ২০ বছর আগে শূন্য হাতেই নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চর নাঙ্গুলিয়ায় এসেছিলেন নদী ভাঙনের শিকার হয়ে। অবশ্য সেটাই নদীতে তাদের ঘরবাড়ি হারানোর প্রথম ঘটনা নয়। প্রথমবার ভাঙনের কবল পড়েছিলেন তারও এক যুগ আগে, তখন তাদের বাড়ি ছিল নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চর লটিয়া গ্রামে। বাপ-মায়ের সঙ্গে সেখান থেকে তারা চলে গিয়েছিলেন তরজারপুল এলাকায়। এরই মধ্যে নূরজাহানের বিয়ে হয়। স্বামী বাহারউদ্দিনের সঙ্গে চলে আসেন মোহাম্মদপুরে। তখন নাঙ্গুলিয়ায় ছিল বনদস্যু বাশার মাঝির রাজত্ব। দস্যুরা বন উজাড় করে চরের জমি বিক্রি করছিল নদীভাঙাদের কাছে। নূরজাহানরাও তিন হাজার টাকায় ৯৬ শতক জমি কিনে বসত গড়েন। তবে বসত গড়ার কাজটা অত সহজ ছিল না। পুকুর খনন করে ভিটার জমি উঁচু করতে হয়েছে। জমিটা বসবাসের উপযুক্ত করার পর দস্যুরা এসে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে বলেছে আরও পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। অনেক কষ্টে ধান চাষ করার পর বলেছে, ধানের অর্ধেক তাদের দিতে হবে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ডেকে নিয়ে বলেছে বাহিনীতে যোগ দিতে। বাহিনীতে যোগ দিতে অনিচ্ছুক পুরুষদের এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ফলে লড়াইটা ছিল নারীদেরই। অবশ্য বনদস্যু ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নূরজাহান বেগমের পাঁচ সদস্যের পরিবার এখন স্বাবলম্বী। শুধু তাই নয়, সরকারি বন্দোবস্ত পাওয়া ৯৬ শতক জমির অর্ধেকের মালিকানাও এখন নূরহাজানের।

এই গল্প শুধু নূরজাহানের একার নয়। নূরজাহানের মতো হাসনা বেগমের পরিবারও পেয়েছে ১৫০ শতক জমি। যার অর্ধেক হাসনার নামে হওয়ায় নিজের মতো করে ঘর-সংসার গোছাতে পারছেন তিনি। হাসনার স্বামী চট্টগ্রামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। মেজ ছেলেটা এক সময় টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেয় এবং এখন একটি এনজিওতে চাকরি করে। হাসনার বাকি তিন সন্তান নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। তাদের পড়াশোনার খরচ হাসনাই বহন করেন বলে জানালেন। তিনি বলেন, 'যত কষ্টই হোক আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করব না আমি।'

সুবর্ণচরের পূর্ব চরবাটা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, চরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার হার অনেক বেড়েছে। গত ১৬ বছর ধরে চরবাটায় আছেন তিনি। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার সন্তান দেলোয়ার ২০০২ সালে যখন এখানে আসেন, তখন পুরো চর ছিল দস্যুকবলিত। তিনি বলেন, 'তখন সন্ধ্যার পরপরই চরের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যেত, চরের জমজমাট হাটগুলোতে হাটবারেও কোনো কোলাহল ছিল না। চারদিকে ছিল ভয় আর আতঙ্ক। মাঝেমধ্যেই রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে ভেসে আসত আর্তচিৎকার। শুরু থেকেই ক্যাম্পাসে আমার জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। সেখানে থাকতে খুব ভয় করত। মানুষের চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেলেও রুম থেকে বের হওয়ার সাহস হতো না। সকালে উঠে শুনতাম কোনো এক বাড়িতে ডাকাতি করে তাদের মেয়েটিকেও ধরে নিয়ে গেছে দস্যুরা।' দস্যুদের কবলে থাকা সেই সময়ের চরের বর্ণনা দিয়ে এই শিক্ষক বলেন, তখন তো মেয়েরা স্কুলেই আসত না। স্কুলে আসবে কী করে- পুরো চর তো ছিল আতঙ্কের জনপদ। পুরুষশূন্য ছিল প্রায় সব ঘরই। মেয়েরা যে কী আতঙ্কে ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। অবশ্য এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই, চর এখন অনেক বদলে গেছে। দস্যু নির্মূলের পর চরের জমিতে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। পড়াশোনা করে না এমন ছেলে তো দূরের কথা, কোনো মেয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা শেষ করে চর নাঙ্গুলিয়ায় যেতেই চরের আসল রূপ দেখা যায়। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। সবুজ পাতায় মুক্তার মতো টলটল করছে শিশির। মাটির সঙ্গে বেড়ে ওঠা এখানকার মানুষের জীবন। চর নাঙ্গুলিয়া যাওয়ার পথে কাজীর দোকান এলাকায় দেখা হয় স্থানীয় যুবক আলাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'এখানে তরিতরকারি, ধানসহ সব ফসলের আবাদ ভালো। আমাদের এই চরের মানুষগুলো অনেক পরিশ্রমী। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ফসল ফলান এখানে। অবশ্য পুরুষের তুলনায় নারীরা একটু বেশিই ভূমিকা রাখেন।' নারীর এমন ভূমিকার অবশ্য অন্য একটি কারণও জানালেন আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, 'বয়ার জমির বন্দোবস্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।' নদী থেকে জেগে ওঠা পয়স্তি জমিকে নোয়াখালীর চরাঞ্চলে বয়ার জমি বলা হয়, হাতিয়ার এমন একটি ইউনিয়নের নামও বয়ারচর। সাধারণত জমির মালিকানা পুরুষের নামে থাকলেও সুবর্ণচরের ১৬টি চর এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে জমিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দিয়ে বন্দোবস্ত দিয়েছে চর উন্নয়ন ও বসতি নির্মাণ প্রকল্প (সিডিএসপি)।

চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত একটি প্রকল্পের নাম সিডিএসপি। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল ইফাদ এবং নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। বর্তমানে এই প্রকল্পের চতুর্থ ধাপের বাস্তবায়ন চলছে। সিডিএসপিতে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের একজন জান্নাতুল নাইম বলেন, 'এখানকার নারীরা অনেক সংগ্রাম করেছেন। তাদের পুরুষরা তাদের একা ফেলে দেশ-বিদেশে থাকতেন। নারীরা চরে থেকে সন্ত্রাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে এখন পর্যন্ত টিকে আছেন। যে কারণে নারীরা আজ এক টুকরো জমির অর্ধেকের মালিক হয়েছেন।' তিনি জানান, ১৯৯৪ সাল থেকে চরের ৩২ হাজার পরিবারকে ৪৩ হাজার একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৬ হাজার নারী হয়েছেন জমির মালিক। এ কারণে নারীদের ওপর সামাজিক নিপীড়ন ও নির্যাতন অনেকাংশে কমেছে।

চরের জমিতে নারীর সমঅধিকারের ফলে বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন, বহুবিবাহ কমেছে বলে স্বীকার করেন মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনামুল হক। তার বাবা আমিনুল হক ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চরক্লার্ক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ওই ইউনিয়নেরই ১২ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন এনামুল হক। পরে ২০১১ সালে চরক্লার্ক ইউনিয়নকে দু'ভাগ করে মোহাম্মদপুর নামে নতুন আরেকটি ইউনিয়ন করার পর তিনি মোহাম্মদপুরের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এনামুল হক বলেন, 'এক সময় চরের ঘরে ঘরে কলহ ছিল। সারাটা দিন কেটে যেত বিচার-সালিশ করে। এখন কয়েক মাস পর পর পারিবারিক কলহের বিচার আসে।' চরের জমিতে নারীর নামে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কারণে পারিবারিক বিরোধ অনেক কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, জমি বন্দোবস্তের শর্তে লেখা আছে, বিয়েবিচ্ছেদ হলেই স্বামী-স্ত্রী দু'জনের নামে দেওয়া বন্দোবস্ত বাতিল হতে পারে। গত তিন মাসে তার কাছে নারী নির্যাতনের কোনো বিচার আসেনি বলেও জানান এই চেয়ারম্যান। নারী নির্যাতন কমার কথা জানালেন চরক্লার্ক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল বাশারও। তিনি বলেন, নারীরা এখন স্বাবলম্বী। নিজের নামে জমি থাকার কারণে এখন তিনি নিজেই পরিবারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে এখন ইচ্ছে করলেই নারীর ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না। পূর্বচরবাটা ইউনিয়ন পরিষদের চরমজিদ ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হাসান বলেন, গত ছয় মাসে তার ওয়ার্ডে একটিও নারী নির্যাতনের বিচার আসেনি। নারী-পুরুষ সামাজিক সমতার এ দৃষ্টান্ত অন্যান্য অঞ্চলেও অনুকরণীয় হতে পারে বলে জানালেন নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) আবদুর রউফ মণ্ডল। তিনি বলেন, 'জমির খতিয়ানে নারীর নাম আগে থাকে। স্বামী-স্ত্রী দু'জনকে সমান অধিকার দিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রভাব পড়েছে নারীর মর্যাদার ক্ষেত্রে। অনেকাংশ কমেছে নারী নির্যাতন।'

আগামীকাল : ভাঙছে নদী জাগছে চর

সরেজমিন সুবর্ণচর-১ : দখল হয়ে যাচ্ছে 'নতুন বাংলাদেশ'

সরেজমিন সুবর্ণচর-২ : উজাড় হয়েছে বন, অরক্ষিত উপকূল

সরেজমিন সুবর্ণচর-৩ : ডাঙায় ক্ষুধা, জলে দস্যু

সরেজমিন সুবর্ণচর-৪ : সর্জন পদ্ধতিতে কৃষিতে বিপ্লব

বিষয় : সুবর্ণচর