ভোটের হাওয়া : টাঙ্গাইল-৩

আওয়ামী লীগের বিভক্তি কাজে লাগাতে চায় বিএনপি

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০১৮   

আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে মনোনয়ন নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিটি না থাকায় নেতৃত্ব সংকট ও দ্বন্দ্ব চলছে দলটির ঘাটাইল শাখায়। এ আসনের বর্তমান এমপি আমানুর রহমান খান রানা হত্যা মামলার আসামি হয়ে একবছরের বেশি সময় ধরে হাজতবাস করছেন। এ অবস্থায় মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের প্রায় হাফ ডজন নেতা। অপরদিকে বিএনপি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী মাঠে জয় পেতে তৎপর রয়েছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, সোনালী ব্যাংকের পরিচালক ড. মো. নুরুল আলম তালুকদার, জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক পিপি এস আকবর খান, তেজগাঁও কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অধীর চন্দ্র সরকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শহীদুল ইসলাম, ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু, প্রয়াত ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে ঢাকা ভিক্টোরিয়া হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান তানভীর রহমান, আওয়ামী লীগে সদ্য যোগ দেওয়া জাকারিয়া মানবকল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিল্পপতি আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্ব স্ব অবস্থানে থেকে তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমসহ দোয়া মাহফিল এবং ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টারের মাধ্যমে সবার সহযোগিতা কামনা করছেন।

বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত এ আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা চারবার এমপি হন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি ধানের শীষের হাতছাড়া হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন চিকিৎসক, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মতিউর রহমান। ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু ঘটে। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর শূন্য আসনে উপনির্বাচন হয়। এ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শহিদুল ইসলাম লেবু। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে জয়ী হন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। স্থানীয়রা বলছেন, এরপর থেকেই লেবু ও রানার মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। দু'জনের সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটে।

এমপি আমানুর রহমান খানের অনুসারীরা বলছেন, জেলে থাকলেও তিনি আবারও মনোনয়ন পাবেন। তবে এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু বলেন, হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকে প্রধানমন্ত্রী আর মনোনয়ন দেবেন না। তার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, উপনির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ১৪টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং নেতাকর্মীরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। নেতাকর্মীরা তার পক্ষে রয়েছেন। আবারও মনোনয়ন পেলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নৌকা উপহার দিতে পারবেন।

তবে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, দলীয় এমপির অনুপস্থিতিতে প্রায় দুই বছর ধরে ঘাটাইলে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম মুখথুবড়ে পড়েছে। আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবুর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘাটাইলে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান মনোনয়ন পেলে নৌকার জয় নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামরুল হাসান খান বলেন, ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক ছিলেন শামসুর রহমান খান শাজাহান। তার সঙ্গে থেকে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করেছি। সর্বোপরি ডাক্তার হিসেবেও জনগণের সেবা করে চলেছি। নেত্রী মনোনায়ন দিলে অবশ্যই জয়ী হবেন বলে জানান তিনি।

ড. মো. নুরুল আলম তালুকদার হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ২০১৩ সালে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতির মাঠে সক্রিয় এই নেতা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন ও জনগণের পাশে রয়েছেন। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করেন। তিনি মনোনয়ন পেলে ঘাটাইলে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের নিরসন করে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে নৌকার জয় নিশ্চিত করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।

মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক পিপি এস আকবর খান বলেন, পরপর দুইবার ঘাটাইল জিবিজি কলেজের ভিপি ছিলাম। দলের দুঃসময়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে কাজ করেছি। আইন পেশায় যুক্ত থেকে দলের নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। মনোনয়ন পেলে সবাইকে নিয়ে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বিশিষ্ট শিল্পপতি আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে নির্বাচন করে হেরে যান। সম্প্রতি তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুকের হাতে ফুলের তৈরি নৌকা উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সচেষ্ট রয়েছি। মনোনয়ন পেলে প্রধানমন্ত্রীকে নৌকার বিজয় উপহার দিতে পারব।

আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শহীদুল ইসলাম বলেন, 'ঘাটাইলকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।'

সাবেক এমপি ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে তানভীর রহমান বলেন, হঠাৎ করে বাবার মৃত্যুতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিদেশে পড়াশোনায় নিমগ্ন ছিলেন। তাই গত দুই নির্বাচনে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে এলাকায় কাজ করতে বলেছেন জানিয়ে তানভীর বলেন, এবার মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। আসনটি পুনরুদ্ধার করতে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলে প্রত্যাশা করছেন তিনি।

এদিকে ঘাটাইলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত ও শক্তিশালী। দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের কোন্দল থাকলেও উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ের সব নেতাকর্মীই বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের প্রতি আস্থাশীল। ইতিমধ্যে তিনি ১৪টি ইউনিয়ন ও সব ওয়ার্ড কমিটি করে দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছেন। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এবার প্রার্থী হতে চাইছেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম। অবশ্য ঘাটাইল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মঞ্জুরুল হক মঞ্জু বলেন, ঘাটাইলে লুৎফর রহমান খান আজাদের কোনো বিকল্প নেই। তিনিই জয়ী হবেন।

লুৎফর রহমান খান আজাদ বলেন, মন্ত্রী থাকার সময় ঘাটাইল উপজেলার রাস্তাঘাট-অবকাঠামোসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। জনগণ তাই তাকে সব সময়ই সমর্থন করছে। জাতীয় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে জনগণের যে সমর্থন পেয়েছেন, তাতে তিনি অভিভূত। আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবো বলে জানান তিনি।

জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গণসংযোগ করে যাচ্ছি। তৃণমূলের পাশাপাশি জেলা বিএনপির নেতারা তার সঙ্গে রয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে জাতীয় পার্টির উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) জেলা শাখার আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান (বড় ভাই) নির্বাচন করার লক্ষ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন।