পলাশবাড়ী মহাসড়কে দুর্ঘটনা ১০ কারণে

আড়াই মাসে নিহত ২৮, আহত ৪০

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

শাহজাহান সোহেল সাদুল্যাপুর (গাইবান্ধা)

দুর্ঘটনার পর মহাসড়ক থেকে জব্দ করা অবৈধ যান রাখা হয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানায়- সমকাল

কংক্রিটের খুঁটিতে নতুন ঘর তৈরির স্বপ্ন নিয়ে উপার্জনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন এন্তাজুল মিয়া। গন্তব্য ঢাকা। সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়ে পরজনমের নতুন ঘরে ঠাঁই হয়েছে তার। সঙ্গে নিয়ে গেছেন প্রিয় কন্যা হেনা আক্তার, স্ত্রী কাকলী বেগম আর বোন আফরোজা বেগমকে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার এন্তাজুল মিয়ার পরিবারের চার সদস্যসহ নিহত হয়েছেন পাঁচজন। রোববার রাতে এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। দরিদ্র বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যদের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এন্তাজুল মিয়া।

শুধু এন্তাজুল মিয়ার পরিবার নয়, গত রোজার ঈদ থেকে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত আড়াই মাসে পলাশবাড়ীতে বড় ধরনের মর্মান্তিক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন শিশু, নারীসহ ২৭ জন। এ সময়ের মধ্যে পলাশবাড়ীতে অপর তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ জন। সব মিলিয়ে মোট ছয়টি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪০ জন।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পলাশবাড়ী উপজেলা শহরের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে প্রায় ৪ কিলোমিটার মহাসড়ক যেন মৃত্যুপুরী। আড়াই মাসে শুধু পলাশবাড়ীতেই ২৮ জনের প্রাণহানি দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে সর্বমহলে। তাই স্থানীয় মসজিদ-মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনাসহ পুলিশের পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে।

বারবার একই মহাসড়কের একই উপজেলায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। প্রাথমিক অবস্থায় এখানে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১০টি কারণ খুঁজে পেয়েছে তারা। সে জন্য কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে পলাশবাড়ীতে। একই সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে দূরপাল্লার গাড়িচালকদের  জন্য ওই জায়গায় করা হয়েছে সামান্য সময় যাত্রাবিরতি। চালকদের ঘুমের ঘোর কাটাতে এ বিরতিতে হাত-মুখ ধুয়ে বিনামূল্যে 'রঙ চা' পান করানোর ব্যবস্থাও করেছে পুলিশ।

পলাশবাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আড়াই মাসে এখানে বড় তিনটিসহ ছয়টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত হওয়ার পর থেকে পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। তাতে দেখা যায়, দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণের মধ্যে এখানকার জন্য দশটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এর সঙ্গে পলাশবাড়ীর বাঁশকাটা মহেশপুর থেকে বিটিসি পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার মহাসড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের অনুসন্ধানে এখানে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- দূরপাল্লার গাড়িতে মাত্র একজন চালক থাকায় ক্লান্ত হয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া, অদক্ষ ও অসচেতন চালকের কারণে রাতে আলোর গতি সম্পর্কে না জানা, কোনো কোনো স্থানে রাস্তার সাইড সোলডারিংয়ে অনেক উঁচু-নিচু থাকা, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় রোড ডিভাইডার না থাকা, ভালো রাস্তা পেয়ে বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালানো, সচেতনতার জন্য রাস্তার ধারে লাগিয়ে রাখা ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, নিয়ম না মেনে ওভারটেক করা, চালকের একটানা গাড়ি চালানো (আপ-ডাউন ট্রিপ মারা), ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো এবং হেলপার কর্তৃক দূরপাল্লার গাড়ি চালানো।

পলাশবাড়ী থানার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আড়াই মাসে মর্মান্তিক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সচিব পর্যায়ে, অপরটি গাইবান্ধা বিআরটিএ অফিস থেকে। তবে এ তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দিয়েছে তার কোনো কপি থানায় নেই বলে জানানো হয়েছে।

বর্তমানে এ মহাসড়কে দুর্ঘটনারোধে পলাশবাড়ী থানার পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকে এবং ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচার চলছে। মহাসড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পথসভা ও সেমিনার করা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কয়েকদিনে পুলিশ মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ বেশকিছু নছিমন, করিমন, কাঁকড়া, পাওয়ার টিলার, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও থ্রি হুইলার আটক করে থানায় রেখেছে। দিন-রাতে সবকিছুই তদারকি করছেন জেলা পুলিশ সুপার।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি ফজলুল করিম প্রধান বলেন, এখানে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা ৪ কিলোমিটার মহাসড়কে থ্রি হুইলার চলাচল একেবারেই নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ গত আড়াই মাসে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে এর সবক'টির জন্য দায়ী এই অবৈধ থ্রি হুইলার। মহাসড়কে থ্রি হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ করাসহ জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছি আমরা।