উচ্ছেদ আতঙ্কে লামার ১৫২ ম্রো পরিবার

বন্যপ্রাণীর চেয়েও বড় আতঙ্ক ভূমিদস্যু

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা,বান্দরবান

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। অথচ বন্যপ্রাণী নয়, প্রতিকূল পরিবেশও নয়- ভূমিদস্যুর দল আতঙ্ক-উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে সেখানকার আদিবাসী ম্রো পরিবারগুলোকে।

লামার দুর্গম এই গ্রাম বা পাড়ার নাম লক্ষণঝিড়ি মুরংপাড়া। লামা সদর থেকে পোপা মৌজার এ গ্রামটিতে হেঁটে যেতে লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লাগে দুই ঘণ্টা। সেখানে বসবাস করে ১০টি ম্রো পরিবার।

ভূমিদস্যুদের হুমকিতে ভীত তারা সবাই। এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকেও যদি উচ্ছেদ হতে হয়, তাহলে হয় দেশান্তর, না হয় মৃত্যুর পথে হাঁটতে হবে তাদের।

চলতি মাসে সরেজমিন দেখা গেছে, লক্ষণঝিড়ি মুরং পাড়ার শুধু এই ১০টি পরিবার নয়, আরও ছয়টি পাড়ার ১৪২টি ম্রো পরিবারও উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। পাড়ার তিন পাশের পাহাড়ি এলাকা দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। তারপর সেখানকার জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে নিজেদের দখলস্বত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ম্রোদের চলাচলের পাহাড়ি কাঁচা পথটিও ভূমিদস্যুদের দখলে এখন। অথচ বেঁচে থাকার জন্য এসব স্থানেই তারা জুম চাষ করত। আর জুমের ফসল (ধান) দিয়েই চলত তাদের পুরো বছরের খাওয়া-দাওয়া।

লক্ষণঝিড়ি মুরং পাড়ার সবাই নির্ভরশীল জুমচাষের ওপর। কিন্তু আগামী বছর দূরে অন্য কোথাও গিয়ে বর্গা হিসেবে জুম চাষ করতে হবে তাদের। এদিকে দখলদাররা কাটা জঙ্গল পরিস্কার করার জন্য যে কোনো সময় আগুন জ্বালাবে। পাড়ার লোকজনকে না জানিয়ে কাটা জঙ্গলে আগুন দিলে তাতে পুরো পাড়াই পুড়তে পারে।

লক্ষণঝিড়ি মুরং পাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) মানক্রাত ম্রো বলেন, তাদের নিজস্ব কোনো বন্দোবস্তি জায়গা নেই। মৌজা হেডম্যানের দেওয়া রিপোর্ট আছে। জুমচাষের আগের জায়গা হারিয়েছেন তারা। এখন আছে শুধু পাড়ার জায়গাটি। সেটিও তাদের একক মালিকানায় নেই। লোকজন পাড়ার বাইরে গরু-ছাগল চরাতে গেলে দখলদারদের লোকজন বাধা দেয়। তিনি প্রশ্ন করেন, জুমচাষ করতে না পারলে, চলাচল করতে না পারলে, গরু-ছাগল পালতে না পারলে খাব কী? নিরুপায় হয়ে কি পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে?

পাইনচুই ম্রো পাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) পারিং ম্রো বলেন, জুমের আগুন দেওয়ার সময় পাড়ার লোকজনকে জানিয়ে করা হয়। তাদের সমাজে এমন রীতিই প্রচলিত। তাই জুমের আগাছা পরিস্কার করার আগুন দিলেও কোনো সময় তাদের বাড়িঘর পোড়ে না। কিন্তু দখলদাররা তাদের উচ্ছেদ করতে কাউকে না জানিয়েই কাটা জঙ্গলে আগুন দিতে পারে- এমন ভয় কাজ করছে তাদের মনে।

সরেজমিন লক্ষণঝিড়ি পাড়াসহ পুরনো তাও পাড়া, নতুন তাও পাড়া, লাইলিয়া ম্রো পাড়া, পুরনো পাইনচুই ম্রো পাড়া, নতুন পাইনচুই ম্রো পাড়া, খ্রিষ্টিয়ান ম্রো পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, এই সাতটি পাড়ায় ১৫২টি ম্রো পরিবার রয়েছে। পোপা মৌজাতে অবস্থিত এ পাড়াগুলোতে শিক্ষিত লোক নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়েকজন ছেলে উচ্চ মাধ্যমিকে পৌঁছুতে পেরেছে। মৌজাটির ৯৫ ভাগ ম্রো-ই বংশপরম্পরায় জুমচাষের (পাহাড়ে বিশেষ কায়দায় চাষ) ওপর নির্ভরশীল। জুমে শুধু ধান নয়- যব, ভুট্টা, মারফা, বেগুন, তুলাসহ নানা জাতের ফসল উৎপাদিত হয়। জুমের জায়গা না থাকলে উৎপাদন সম্ভব নয়। আর জুমের জায়গা না থাকার অর্থই স্থানান্তরিত হওয়া- দেশান্তরিত হওয়া।

পাড়া সাতটিতে ঘুরে দেখা গেছে, দখলদাররা বেছে বেছে ম্রোদের জুমের জায়গাগুলোতে জঙ্গল কেটেছে। প্রায় ৫০০ একর জায়গাজুড়ে এভাবে খণ্ড খণ্ড জায়গায় জঙ্গল কাটা হয়েছে। পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন অভিযোগ করেন, ভূমি দখলকারীর লোকজন তাদের ভয়ভীতি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এ কাজ করেছে। সেসব স্থান থেকে কাঠ, বাঁশ, লাকড়ি সংগ্রহ করতেও বাধা দিচ্ছে তারা। এমনকি সেখানে তাদের গরু চরাতেও দেওয়া হচ্ছে না। মামলা ও পুলিশের ভয়ও দেখানো হচ্ছে তাদের।

তাও পাড়ার নিংপাই ম্রো বলেন, ৪৫ বছর ধরে নিজেদের জায়গায় জুমচাষ করে আসছেন। এভাবে কোনো মতে সংসার চলে তাদের। অথচ এত বছর পরে কয়েকজন 'বাঙালি' (দখলদার) এসে বলছে, এসব জায়গা তাদের।

পুরনো পাইনচুই ম্রো পাড়ার কাইনওয়াই ম্রো বলেন, এখানে বন্যশূকর, বানর, হাতি, বনবিড়াল এবং গেছোবাঘও ছিল। এসব বুনো জানোয়ারদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছি। বাঁচার জন্য সংগ্রাম করে চলেছি। কিন্তু প্রভাবশালী কয়েকজন 'বাঙালি' এসে জোর করে তাদের জুমের জায়গা দখলে নিয়েছে।

এই উচ্ছেদ আতঙ্কের মূলে রয়েছেন রবিউল হোসেন ভূঁইয়া। স্থানীয় ম্রোদের কাছে রবি কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। অন্যরা হলেন- মেরেডিয়ান কামাল নামে পরিচিত লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক কামাল উদ্দিন ও মোস্তফা গ্রুপের স্বত্বাধিকারী শফিক উদ্দিন আহম্মদ।

রবিউল হোসেনের দাবি, পোপা মৌজার স্থানীয় ম্রোদের কাছ থেকে তিনি ১০০ একর জায়গা কিনেছেন। তার কেনা জায়গাতেই জঙ্গল কেটেছে শ্রমিকরা। অন্য কোনো জায়গাতে হাত দেওয়া হয়নি। এ-সংক্রান্ত বৈধ কাগজ কাছে থাকার দাবিও করেন তিনি।

কামাল উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পোপা মৌজায় ১০ একর জায়গা কেনার কথা জানান। পোপা মৌজায় তিনি কখনও আসেননি উল্লেখ করে বলেন, জায়গাটি রবিউল হোসেনের মাধ্যমে কিনেছি। কেউ কোনো কিছু দখল করেছে কি-না, তা জানি না। ম্রোদের জায়গা দখল করেছি, এ অভিযোগও আপনার (সমকাল প্রতিনিধি) মাধ্যমে জানতে পারছি। তবে এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো।

মোস্তফা গ্রুপের শফিক উদ্দিন আহম্মদের নামে পোপা মৌজায় ১৯ একর জায়গা রয়েছে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাদের গ্রুপের (মোস্তফা গ্রুপ) মাধ্যমে পোপা মৌজাতে জায়গা নেওয়া হয়েছে। তবে কত একর জায়গা আছে, তা তিনি জানাননি। তিনি বলেন, তাদের গ্রুপ সেখানে স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছে। সেখানকার লোকজনকে শিক্ষিত করে তোলার চিন্তা করছে।

এলাকাটি দুর্গম, সেখানে লোকজনও তেমন নেই, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেটি ঠিকমতো চলে না- এসব জানিয়ে শফিক উদ্দিনকে প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে আপনারা সেখানে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন- এ প্রশ্নে শফিক উদ্দিন বলেন, এলাকাটি দুর্গম কি-না, তা জানা নেই তার। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার মতো পরিবেশ সেখানে না থাকলে এসব অন্য কোথাও করা হবে।

লক্ষণঝিড়ির ম্রো পাড়ার ম্রাথোয়াই ম্রো। পঞ্চম শ্রেণি অবধি পড়াশোনা করায় তিনি অন্য আদিবাসীদের তুলনায় খানিকটা অগ্রণী- নিজেদের ভূমির অধিকারের দাবি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন তিনি। তিনি জানান, সাতটি পাড়ার লোকদের প্রায় ৫০০ একর জায়গা অবৈধভাবে দখল করেছে ভূমিদস্যুরা- যেসব স্থানে তারা একসময় জুমচাষ করতেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি কয়েকজন ম্রো নিয়ে স্থানীয় জেলা প্রশাসক, নির্বাহী কর্মকর্তা, লামা থানা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় ভূমি ও ভূমিদখল সংক্রান্ত আবেদন করেছেন। কিন্তু প্রশাসনের কোনো সাহায্য পাননি। ভূমিদস্যুরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ম্রাথোয়াই ম্রো আরও বলেন, গত ৩ অক্টোবর প্রতিকার পাওয়ার আশায় তারা লামা উপজেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। স্থানীয় সাংবাদিকরা কয়েকটি পত্রিকায় এ-সংক্রান্ত সংবাদও প্রকাশ করেন। ভূমি দখলকারীরা প্রভাবশালী হওয়াতে তিনি নিজেও ভয়ে আছেন বলে জানান।

লামা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর এ জান্নাত বলেন, পোপা মৌজার লোকজন তার কাছে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আবেদন করেছেন। একে দুর্গম এলাকা, এর ওপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন- এ জন্য একটু সময় লাগছে তার। আগামী ডিসেম্বরেই তদন্ত টিম গঠন করে সেখানে পাঠানো হবে। জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম বলেন, সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি কেমন তা জানি না। তবে তাদের আবেদনপত্র নেওয়া হয়েছে।

বিষয় : উচ্ছেদ