ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

পদ্মার ভাঙনে ঘোর দুশ্চিন্তা

পদ্মার ভাঙনে ঘোর দুশ্চিন্তা

টঙ্গিবাড়ীর দিঘিরপাড় বাজারের পাশে পদ্মার ভাঙনের চিত্র - সমকাল

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

পদ্মার তীব্র স্রোতে ভাঙনের মুখে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় বাজার ও আশপাশের এলাকা। ওই এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ হয়েছে দুই বছর আগে। তবে এখনও তা নির্মাণে নেওয়া হয়নি উদ্যোগ। ভাঙনরোধের জন্য যেসব জায়গায় ফেলা হয়েছিল জিও ব্যাগ, সেখানেও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বাজারের ব্যবসায়ী ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।

এক সময় দিঘিরপাড় বাজারের খ্যাতি ছিল আশপাশের এলাকায়। পদ্মাপাড়ের বাজারটি গত দুই বছরে ভাঙতে ভাঙতে ছোট হয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন ওই বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘চলতি বর্ষায় নদীর স্রোত ও তীব্র ঢেউয়ে আমার দোকানের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। যে কোনো সময় নদীতে দোকানটি বিলীন হতে পারে।’ ভাঙন ঠেকাতে মাসখানেক আগে সেখানে বাঁশের বেড়া দিয়েছিলেন আনোয়ার। জিও ব্যাগ ফেলার কথা বলে ঠিকাদারের লোকজন ওই বেড়া সরিয়ে ফেলে। এর এক মাস পেরিয়ে গেলেও জিও ব্যাগ আর ফেলা হয়নি।

একই অভিযোগ ওই বাজারের অন্য ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, শুকনো স্থানে জিও ব্যাগ ভর্তি করে ফেলে রেখেছেন ঠিকাদারের লোকজন। পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে ভাঙন দেখা দিলেও জিও ব্যাগ নদীতে ফেলা হচ্ছে না। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে দিঘিরপাড় বাজার, মূলচর গ্রামসহ আশপাশের এলাকা। কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ফলে পদ্মা আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। প্রতিদিনই ভাঙনের তাণ্ডব চলছে তীরবর্তী এলাকায়। বিলীন হয়ে গেছে ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এর ফলে দিঘিরপাড় বাজারের  ব্যবসায়ীসহ মূলচর গ্রামের হাজারো বাসিন্দার দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়।

স্থানীয় বাসিন্দা শফি খান বলেন, ‘এই স্থানে বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প পাস হইছে। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলে শুনেছি। এর দুই বছর শেষ হয়ে গেছে। এখনও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। আমাদের বাড়িঘর ভেঙে পদ্মার পেটে যাওয়ার পরে কী বাঁধ হবে?’

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন দশকের বেশি সময় ধরে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নে ভাঙন তাণ্ডব চালাচ্ছে পদ্মা। ইতোমধ্যে দক্ষিণ মূলচর, মিতারা, হাইয়ারপারের কয়েকশ বাড়িঘর, মসজিদ, আবাদি জমি গেছে নদীটির পেটে। দিঘিরপাড় বাজারের অন্তত ২০০ মিটার পদ্মায় বিলীন হয়েছে। দুই বছর আগে যখন তীব্র ভাঙন দেখা দেয়, তখন কিছু জায়গায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধে চেষ্টা চালায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী বেড়িবাঁধের প্রকল্প নেওয়া হয়। চলতি বর্ষায় দিঘিরপাড় বাজার ও দক্ষিণ মূলচর গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে জিও ব্যাগ সরে গেছে। ফলে মূলচর গ্রাম ও দিঘিরপাড় বাজার ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে তীরের জনপদ ও বাজার রক্ষায় জেলার লৌহজং উপজেলার খড়িয়া গ্রাম থেকে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় বাজার পর্যন্ত ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকা। ২০২২ সালের মে মাসে এর কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ভাগে প্রকল্পটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দিঘিরপাড় অংশের দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিগমা ইঞ্জিনিয়ারিং। তাদের ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। অথচ এখনও তারা কাজই শুরু করেনি।

সিগমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারিগরি বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুস সালাম এ বিষয়ে সমকালের কাছে দাবি করেন, স্থায়ী বাঁধের কাজ তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করবেন। ব্লক বসানোর আগে যেসব কাজ করা দরকার, সেগুলো শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাকি কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

বালুভর্তির জিও ব্যাগ না ফেলে কেন স্তূপ করে রাখা হয়েছে– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পানির স্তর ও জিও ব্যাগ সঠিকভাবে ভরা হয়েছে কিনা তা পাউবো কর্মকর্তারা যাচাই করবেন। তাদের সম্মতি পাওয়ার পরই জিও ব্যাগ শিগগির পানিতে ফেলা হবে।

তবে এসব বিষয়ে ক্ষোভ জানান দিঘিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শ্যামল মণ্ডল। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, মানুষের বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার পর কি নদীতে জিও ব্যাগ ফেলবেন তারা? এর আগেও দুই দফায় মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন। এ দুর্দশার কথা ভেবে প্রধানমন্ত্রী বাঁধ নির্মাণে টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। অথচ এখনও বাঁধের কোনো খবর নেই।

এসব দেখার জন্য কেউ নেই– এমন আক্ষেপ করে শ্যামল মণ্ডল বলেন, তিন বছরের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার কথা। এর দুই বছর কেটে গেছে। এখনও কাজ শুরুই করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

মুন্সীগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকোশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী এ বিষয়ে দাবি করেন, প্রকল্পের সব জায়গায় কাজ ভালোভাবেই চলছে। গুণগত মানও ভালো। তবে দিঘিরপাড় বাজার এলাকায় ঠিকাদার ধীরগতিতে কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙনকবলিত ও ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে– এমন জায়গায় জিওব্যাগ ফেলতে বলেছি। তারা ইতোমধ্যে জিও ব্যাগে বালু ভরাট শেষ করেছে। বাকি প্রক্রিয়া শেষ হলেই এসব নদীতে ফেলা হবে।’

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থায়ী বাঁধের কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান পাউবোর নির্বাহী প্রকোশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী।

আরও পড়ুন

×