ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

কৃষকের দুঃখ ভাঙা বেড়িবাঁধ

কৃষকের দুঃখ ভাঙা বেড়িবাঁধ

পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। শুক্রবার সকালে রৌমারীর যাদুরচর ইউনিয়নের সরকারপাড়া এলাকার দৃশ্য - সমকাল

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

চাক্তাবাড়ি এলাকায় ১৭ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায় ২০১৯ সালে। এখনও বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি কেউ। এ কারণে প্রতিবছর ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে তলিয়ে যায় ফসলি জমি। তখন পানিবন্দি হয়ে পড়ে অর্ধশত পরিবার। বর্ষার পর আশপাশের সব জায়গার পানি নেমে গেলেও থেকে যায় ফসলি জমির পানি। এখন পানির নিচে ৪২০ হেক্টর ফসলি জমি। জলাবদ্ধতার কারণে পাঁচ বছর ধরে আমন ধান ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। এমন জলাবদ্ধতার জন্য চাক্তাবাড়ি-ধনারচর-রাজীবপুর বেড়িবাঁধের ভাঙনকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী।

গতকাল শুক্রবার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, রৌমারী উপজেলা সদর ইউনিয়নের চাক্তাবাড়ি সুইট মোড় থেকে কর্তিমারী মাস্টারপাড়া এলাকা পর্যন্ত ফসলি জমিতে পানি থইথই করছে। ব্রহ্মপুত্র ও সোনাভরী নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাক্তাবাড়ি এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে গোটা এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে কর্তিমারী বাজার এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। এ ছাড়া ধনারচর নতুন গ্রাম এলাকায় নির্মিত একটি সেতুর মুখ বন্ধ করে নির্মাণ করা হয়েছে বসতি। এতে পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

যাদুরচর সরকারপাড়ার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছিলেন তিনি। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার
টাকা। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে সব ধান গাছ তলিয়ে আছে।

যাদুরচর চাক্তাবাড়ি গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলামের ভাষ্য, তিনিও দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান লাগিয়েছেন। সেই ধানও এখন পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে আছে। প্রতিবছর চাক্তাবাড়ির ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে বন্যার পানি ঢুকলে আর বের হয় না।

ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে সরকারপাড়া এলাকার সাইম সরকারের দুই বিঘা জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর পুকুরের ১০ মণ মাছ বের হয়ে গেছে। ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে এমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি তাঁর।

অবসরপ্রপ্ত সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, বাড়ির চারপাশে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকয় শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন তাদের মা-বাবা। নৌকায় করেও পারাপার করতে হয়। আবার অনেক সময় দূর এলাকা দিয়ে ঘুরে যেতে হয়।

কথা হয় স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক, আবুল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ গাড়িয়াল, গফুর উদ্দিন, আজিবর রহমান, মজিবর রহমান, সানি সরকার, ফুল মিয়ার সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, পাঁচ বছর আগে বন্যার পানিতে চাক্তাবাড়ি এলাকায় ১৭ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। অথচ এখন পর্যন্ত বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে বন্যার সময় পানি ঢুকে পড়ে। কিন্তু বের হতে পারে না। জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।

যাদুরচর ইউপি সদস্য কৃষক আবুল কালামের ভাষ্য, চাক্তাবাড়ি এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে বন্যার পানি ঢুকে তলিয়ে যায় কয়েকশ হেক্টর আবাদি জমিসহ ভাষাসংগ্রামী রোস্তম আলী দেওয়ানের কবর। পানিবন্দি হয়ে পড়ে অর্ধশত পরিবার। তিনি বলেন, ভাঙা বেড়িবাঁধটি নিয়ে যাদুচরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরবেশ আলী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইমান আলী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তার পরও কোনো কাজ হচ্ছেন না। গরিবের কান্না কে শোনে?

বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছেন রৌমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইমান আলী। তাঁর দাবি, পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এটা কীভাবে নিরসন করা যায়, সেই চেষ্টা চলছে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আফসার আলী জানান, ওই এলাকার ১ হাজার ২৫০ কৃষকের ৮০০ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৪২০ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে আছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরীর দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ করতে পারছেন না ওই এলাকার কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আরও পড়ুন

×