স্বাস্থ্যসেবার মাঠচিত্র (৩)

পদে আছে ভূরি ভূরি ডাক্তার কোথায়

বরিশাল অঞ্চল

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু জাফর সালেহ, বরগুনা

প্রায় ১২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র অবলম্বন বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল। তবে চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে ৪২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কাগজে-কলমে কর্মরত প্রায় চার ভাগের এক ভাগ- ১১ জন। আর বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র চারজনকে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর চিত্র কিছুটা বদলেছে। সরেজমিন গত ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি প্রায় একই নাজুক দশা দেখা যায় আমতলী, পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এসব হাসপাতালে পদ আছে অনেক; কিন্তু সে তুলনায় চিকিৎসক রয়েছেন তিন ভাগের এক ভাগ। যারা কর্মরত আছেন তাদের হাসপাতালে না আসাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা সেবাবঞ্চিত অনেকে বললেন, সেবাই যদি না পাওয়া যায়, এত পদের কী দরকার। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল :বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পদায়ন হওয়া ১১ জনের মধ্যে ডা. হাসাইন ইমাম ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর যোগদান করে চলে যান। এরপর এক দিনের জন্যও কর্মস্থলে আসেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে একাধিকবার চিঠি দিলেও তা কাজে আসেনি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসাইন মল্লিক ও ডা. আসাদুজ্জামান অনুপস্থিত। ডা. সুবর্ণা ইসলাম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। এ ছাড়া হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সোহরাব উদ্দীন বেশিরভাগ সময় প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। এর বাইরে ডা. কামরুল আজাদ, ডা. আক্তারুজ্জামান ও ডা. গোলাম সগীর মজনু প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করেনি। সব মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া তিনজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম। এতে সেবাবঞ্চিত হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

২৮ জানুয়ারি দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালের আউটডোরে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় লেগে আছে। টিকিট নিয়ে ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে আছেন তারা। কিন্তু আউটডোরে কোনো চিকিৎসক নেই। অসুস্থ নারী-শিশুরা হাসপাতালের বারান্দায় অসহায় হয়ে বসে আছে। এ সময় কথা হয় বরগুনা সদর উপজেলার পরীরখাল এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, এত বড় একটি হাসপাতাল একজন ডাক্তার দিয়ে চলছে। তার অভিযোগ, একদিকে চিকিৎসক পাওয়া যায় না, অন্যদিকে দেওয়া হয় না ওষুধ। শুধু একটি প্রেসক্রিপশন দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পৌর শহরের চরকলোনি এলাকার রোগী নাজমুল ইসলাম শিমুল বলেন, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বসে থেকেও বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখাতে পারেননি। এমন রোগীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বরগুনা হাসপাতালে না এসে বাড়ি বসে বিনাচিকিৎসায় মারা যাওয়াও ভালো।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সোহরাব উদ্দীন বলেন, মাত্র সাতজন দিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রাখা খুবই দুরূহ। তবে তিনজন চিকিৎসকের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ূন শাহীন খান বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে এ মুহূর্তে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশামতো চালানো যাচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে।

আমতলী :এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট গুরুতর আকার ধারণ করেছে। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ২১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কাগজে-কলমে কর্মরত আছেন ছয়জন। তাদের মধ্যে তিনজন অন্য হাসপাতালে সংযুক্ত এবং একজন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় রোগীদের সেবা দিতে পারেন মাত্র দু'জন।

গত ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি আমতলী হাসপাতালে সরেজমিন জানা যায়, কর্মরত ছয় চিকিৎসকের মধ্যে ডা. শাকিলা আক্তার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে, ডা. মুন এম সাদ ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্ত, ডা. ফরহাদ করিম অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন।

পাথরঘাটা :পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭টি পদের বিপরীতে ২৫টি পদ শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে দু'জন চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), অন্যজন জরুরি বিভাগে নিয়োজিত। আউটডোরে কোনো ডাক্তার নেই। এতে রোগীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

বামনা :এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স-কর্মচারী ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেবার মান তলানিতে। এ হাসপাতালে ১৫ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কাগজে-কলমে আছেন চারজন। এর মধ্যে ডা. আহসান উল্লা ছুটিতে থাকায় ইউএইচএফপিও ও অন্য দু'জন চিকিৎসক রোগীদের সেবা দিচ্ছেন।

বেতাগী :এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৮ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও ২২টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত ছয়জনের মধ্যে একজন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে সংযুক্ত, আরেকজন ঢাকায় প্রশিক্ষণে রয়েছেন। বর্তমানে চারজনই কাজ চালাচ্ছেন।