ওদের মারল কারা

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

বাসা থেকে খেলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছর বয়সী শিশু নুদরাত আক্তার। পাঁচ দিন পর চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডের পাহাড়ি এলাকা থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নগরের বাকলিয়া থানার ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের বাসায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ইলহাম বিনতে নাসিরকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নগরের আকবরশাহ থানার কাট্টলী বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে ১১ বছরের এক শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শিশুটি না ফেরার দেশে চলে যায়। এই তিন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ বছরের জানুয়ারির মধ্যে। কিন্তু তাদের হত্যাকারী কে বা কী কারণে নিষ্পাপ শিশুগুলোকে হত্যা করা হলো- এখনও জানতে পারেনি পুলিশ। এক শিশু হত্যার আগে ধর্ষণেরও শিকার হয়েছে। তার কোনো পরিচয়ও বের করা যায়নি। অগ্রগতি বলতে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে শুধু 'তথ্য সংগ্রহ চলছে'। এ অবস্থায় মামলার তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ  করেছেন নুদরাত ও ইলহামের পরিবার।

শিশু নুদরাত পরিবারের সঙ্গে নগরের বাকলিয়া থানার ইসহাকের পুল এলাকায় থাকত। গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি খেলার জন্য বাসার নিচে নামে সে। দুই ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। না পেয়ে বড় বোন রোজি আক্তার বাকলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে কোতোয়ালি থানার সার্সন রোড এলাকার পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শিশুটির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হলেও এর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এক বছর পার হতে চললেও এ শিশু হত্যার কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি সিআইডি।

নুদরাতের বড় বোন রোজি আক্তার সমকালকে বলেন, 'ছোট বোনের শোকে আমরা বাবাকেও হারিয়েছি। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদেরকে চট্টগ্রাম ছাড়তে হয়েছে। এক বছর পার হলেও নিষ্পাপ বোনটিকে কারা, কেন হত্যা করেছে তার কিছুই জানতে পারিনি। আমাদের সঙ্গে তো কারও শত্রুতা ছিল না। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে বলে শুনেছি। কিন্তু তাদের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমার বোন হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।'

এ প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি চট্টগ্রামের পরিদর্শক দেবাশীষ চৌধুরী বলেন, মামলাটির তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এখনও তথ্য সংগ্রহ করছি। হত্যাকারীদের এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি।

নগরের বাকলিয়া ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার এমএস লায়লা ভবনের ছয়তলায় দুই মেয়ে ইলহাম ও জারিনকে নিয়ে থাকতেন মা নাসরিন আক্তার খুশবু। স্বামী মো. নাসির প্রবাসী। গত বছরের ২৭ জুন সকাল ৮টায় ছোট মেয়ে জারিনকে স্কুলে পৌঁছে দিতে বাসা থেকে বের হন তিনি। বাসায় ফিরে দেখেন বিছানায় বড় মেয়ের গলাকাটা লাশ পড়ে আছে। এ সময় তার চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন পাশের ফ্ল্যাটে থাকা ছোট জায়ের ভাই শিক্ষানবিশ আইনজীবী রিজুয়ান কবির রাজু। তিনি এসে ইলহামকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার দু'দিন পর বিদেশ থেকে ফিরে আসেন ইলহামের বাবা নাসির। তিনি বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। এর পর সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে রিজুয়ান কবির রাজুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। কিন্তু তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেননি। তিনি এখন জামিনে আছেন। গত বছরের ২৬ জুলাই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি।

তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইলহামের বাবা নাসির সমকালকে বলেন, 'আট মাস পার হয়ে গেছে। মেয়ের হত্যাকারী কে আজও তা জানতে পারলাম না। মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মেয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই। তবে অযথা কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।'

এ প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক স্বপন কান্তি বড়ূয়া বলেন, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে খুনি হিসেবে শনাক্ত করা যায়নি। তবে একজনকে আমরা সন্দেহ করছি। এ নিয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাই করছি।

গত ২৩ জানুয়ারি নগরের আকবরশাহ থানার কাট্টলী বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে ১১ বছর বয়সী এক শিশুটি ফেলে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় তার মুখ বাঁধা ছিল। ওড়না দিয়ে হাত-পা বাঁধা। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন। শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান আকবরশাহ থানার এসআই নুরুল আলম। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যায় শিশুটি। এ ঘটনায় এসআই নুরুল আলম বাদী হয়ে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু শিশুটির কোনো পরিচয় বের করতে না পারায় তার হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আকবরশাহ থানার এসআই বদিউল আলম বলেন, দেশের সবগুলো থানায় শিশুটির ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিচয় বের করা যায়নি। এ ছাড়া যেখানে মেয়েটিকে পাওয়া গেছে, সেটি একটি নির্জন এলাকা। কোনো সিসি ক্যামেরা নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি। এ কারণে খুনিদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই।

বিষয় : ওদের মারল কারা