চট্টগ্রামে ধরা পড়া ৬০০ স্বর্ণবার

চোরাচালানের হোতা ঢাকার আলমগীর

পাচারে ব্যবহূত বিলাসবহুল গাড়ি

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জে প্রায় ২৭ কোটি টাকার ৬০০ স্বর্ণবার চোরাচালানের মূল হোতা ঢাকার মোহাম্মদপুরের চাঁন হাউজিং এলাকার রাজিয়া সুলতানা রোডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আলমগীর হাসান। তিনি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভার মোবারকপাড়ার মৃত বাদল খানের ছেলে। গোপন সিন্ডিকেট তৈরি করে ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকা ও রাজবাড়ীতে স্বর্ণ পাচার করে আসছিলেন তিনি। মোটা টাকার অবৈধ কারবার। আয়োজনও কম নয়। স্বর্ণ চোরাচালানে তিনি ব্যবহার করতেন মিতসুবিশি ও নিশান ব্র্যান্ডের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। সেই গাড়ি চালাতে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন চুক্তিতে কাজ দেন নিজ এলাকার বিশ্বস্ত দুই যুবককে। একটি চালান নিয়ে ধরা পড়ার পর চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ওই দুই যুবক- রাকিবুল হাসান রাকিব ও করিম খান কালু। ১১ মার্চ জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

জবানবন্দিতে স্বর্ণ পাচারকারী করিম খান কালু জানান, তিনি ও রাকিব একই ক্লাসে পড়তেন। তারা এলাকায় গাড়ি চালাতেন। পরে রাকিব ঢাকায় চলে যান। সেখানে মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী আলমগীর হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর দুই বন্ধু আলমগীরের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি নেন। তাদের কাজ ছিল স্বর্ণ পাচার করা। পল্টনে বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে গাড়ি নিয়ে তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেট এলাকায় যেতেন। সেখানে ভিওআইপি নম্বর থেকে পার্টিকে ফোন দিতেন। তারা এসে গাড়িটি নিয়ে যেত। কোথায় নিতে যেত জানতেন না তারা। নেওয়ার সময় একজন এলেও কিছুক্ষণ পর দু'জন এসে গাড়িটি বুঝিয়ে দিয়ে যেত। তারপর স্বর্ণবার নিয়ে তারা ঢাকায় চলে আসতেন। কালু আরও জানান, চট্টগ্রাম থেকে নেওয়া স্বর্ণবারগুলো ভারতে পাচার হতো। এর আগে বহুবার চট্টগ্রাম থেকে স্বর্ণবার নিয়ে গেছেন তারা।

স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামি করিম খান কালু চুয়াডাঙ্গার দর্শনার  মোবারকপাড়ার আলী হোসেন খানের ছেলে। আর দর্শনা পৌরসভার সামপুরের মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে।

জবানবন্দিতে রাকিব জানান, গত ১৫ জানুয়ারি বিয়ে করার ১০-১৫ দিন পর কালু ফোন করে তাকে দর্শনা থেকে ঢাকায় আসতে বলেন। আসার পর জানান, চট্টগ্রাম যেতে হবে। ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে রওনা দিয়ে পরের দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে যান তারা। সেখান থেকে স্বর্ণবার নিয়ে পল্টন এলাকায় ফেরার পথে গাড়িসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।

স্বর্ণপাচারে ব্যবহূত হতো মিতসুবিশি ও নিশান গাড়ি :চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা ও রাজবাড়ীতে স্বর্ণ পাচারে ব্যবহূত হতো মিতসুবিশি ও নিশান ব্র্যান্ডের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। দুটি গাড়ির মালিকই আলমগীর হাসান। আলমগীরের নির্দেশনা অনুযায়ী গাড়ি দুটি ঢাকায় একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখতেন আসামি করিম খান। চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি ঢাকায় আসার পর একজন লোক এসে নিয়ে যেতেন। আরেকজন লোক এসে ওই নির্দিষ্ট স্থানেই গাড়ি দিয়ে যেতেন। এভাবেই জবানবন্দিতে দুই গাড়ির তথ্য জানান আসামি রাকিব। দুটির মধ্যে নিশান ব্র্যান্ডের গাড়িটি স্বর্ণবারসহ জব্দ করেছে পুলিশ।

মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনে স্বর্ণ চোরাচালান :রাকিব জানান, মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতন চুক্তিতে স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত হন তিনি। তার কাজ ছিল স্বর্ণ পাচারের গাড়িটি ঢাকা থেকে চালিয়ে চট্টগ্রামে নেওয়া। আবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরা। ঢাকা ছাড়াও রাজবাড়ীতে স্বর্ণ পাচার করতেন তারা। চুক্তি অনুযায়ী অন্য কেউ গাড়ি চালালে শুধু গাড়িতে বসে থাকাই ছিল তার কাজ।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গেছে আরও পাঁচটি চালান, রাজবাড়ীতে দুটি :আসামি রাকিব জবানবন্দিতে বলেন, 'চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেওয়ার সময় পথে ধরা পড়া চালানের আগে আরও পাঁচটি চালান নিয়ে গেছি আমরা। প্রতিবারই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গেট থেকে স্বর্ণবার নিয়ে গেছি। তবে যারা স্বর্ণবার দিয়ে যেত, তাদের পরিচয় জানি না। দেখলে চিনব। চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাজবাড়ীতে দু'বার স্বর্ণ পাচার করেছি। স্বর্ণগুলো কাপড়ের ব্যাগে করে গাড়ির ফ্লোরে সিটের নিচে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা হতো।

ভারতে পাচার হতো স্বর্ণবার :আসামি রাকিব ও কালু জানান, ধরা পড়া স্বর্ণবারগুলো ভারতে পাচারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। এর আগেও চট্টগ্রাম থেকে নেওয়া স্বর্ণবার ভারতে পাচার করা হয়েছে। ভারতে স্বর্ণবার চোরাচালানে কালু তার বিশ্বস্ত বন্ধু রাকিবকে সম্পৃক্ত করেন। সে জন্য কালু তার পছন্দের একটি মেয়েকে রাকিবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কালুর মধ্যস্থতায় গত ১৫ জানুয়ারি তাদের বিয়ে হয়।

গত ৩ মার্চ মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকায় ৬০০টি স্বর্ণবারসহ কালু ও রাকিবকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বিষয় : চট্টগ্রামে ধরা পড়া ৬০০ স্বর্ণবার